একটি পরিবারের সকাল শুরু হয় রান্নার গন্ধে, ঘর গোছানোর শব্দে কিংবা শিশুকে স্কুলে পাঠানোর ব্যস্ততায়। এসব কাজের বড় অংশ সামলান গৃহশ্রমিকেরা। অথচ অন্যের পরিবারের দৈনন্দিন জীবন সহজ করতে গিয়ে তাঁদের নিজেদের সংসার, সন্তান, অসুস্থতা ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।
গৃহশ্রমিকের কাজকে অনেক সময় সহজ বা স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধোয়া, শিশুর যত্ন ও প্রবীণদের দেখাশোনা—প্রতিটি কাজেই সময়, দক্ষতা, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। এই শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি, বিশ্রাম, ছুটি ও নিরাপত্তা পাওয়া তাঁদের অধিকার; অনুগ্রহ নয়।
এই বাস্তবতা তুলে ধরেছে ‘হ্যান্ডস দ্যাট হোল্ড হোমস’ নামের আলোকচিত্র প্রদর্শনী। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গোলাপি ভ্যানে সাজানো ছবিতে স্থান পেয়েছে ১০ নারী গৃহশ্রমিকের জীবন ও সংগ্রাম। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত সুনীতি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ঘিরে তৈরি এই উদ্যোগে তাঁদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব ও অধিকার আদায়ের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনীটি মনে করিয়ে দেয়, গৃহশ্রমিকেরা কেবল সেবাদানকারী নন; তাঁরাও শ্রমের মর্যাদা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিদার।
প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়নে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০১৯ সালে জরিপে অংশ নেওয়া গৃহশ্রমিকদের ১২ শতাংশ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন; ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭৪ শতাংশ। মজুরি নিয়ে দরকষাকষির সক্ষমতা বেড়েছে ২৩ শতাংশ থেকে ৬১ শতাংশে। কিন্তু লিখিত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছিল মাত্র ৮ শতাংশের, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ শতাংশে।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য স্পষ্ট। গৃহশ্রমিকেরা এখন আগের তুলনায় নিজেদের অধিকার সম্পর্কে বেশি জানেন এবং মজুরি নিয়ে কথা বলার সক্ষমতাও অর্জন করছেন। কিন্তু নিয়োগের শর্ত লিখিত না থাকলে সেই অধিকার বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মৌখিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে কিংবা মজুরি ও কাজের সময় নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে শ্রমিকের পক্ষে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ হতে পারে।
গৃহশ্রমিকদের অনানুষ্ঠানিক কর্মপরিবেশে এ সমস্যার প্রভাব আরও বেশি। কাজের নির্দিষ্ট সময়, সাপ্তাহিক ছুটি, অসুস্থতার সময় করণীয়, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা চাকরি হারানোর পর সহায়তার বিষয়ে স্পষ্ট ব্যবস্থা না থাকলে শ্রমিককে অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাজ করতে হয়। মাতৃত্বকালীন সময়ে সুরক্ষা ও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাও অনেকের জন্য বড় উদ্বেগ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মস্থলে হয়রানি ও নির্যাতনের ঝুঁকি। অক্সফামের ২০২২ সালের গবেষণায় অংশ নেওয়া নারী গৃহশ্রমিকদের ৯৩ শতাংশ কর্মস্থলে হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ মানসিক, ৬১ শতাংশ মৌখিক এবং ২১ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের কথা বলেছেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এই অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত বাসায় কর্মরত নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
গৃহশ্রমিকের কর্মস্থল অন্যের বাড়ি হওয়ায় সেখানে অভিযোগ জানানো কিংবা অন্যায় আচরণের প্রমাণ তুলে ধরা অনেক সময় কঠিন। সহকর্মী বা আনুষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থা না থাকলে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেও বাধা তৈরি হয়। তাই কর্মস্থল ব্যক্তিগত হলেও শ্রমিকের নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করার দায় এড়ানো যায় না।
মজুরি নিয়ে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়া অবশ্যই ইতিবাচক। প্রকল্পের মূল্যায়নে জরিপভুক্ত ৪১ শতাংশ গৃহশ্রমিক বেশি মজুরি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন; তাঁদের গড় মাসিক আয় বেড়েছে ৮৫০ টাকা। তবে প্রকল্পের এই অর্জনকে সব গৃহশ্রমিকের পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি দেখায়, দক্ষতা, অধিকার সচেতনতা ও দরকষাকষির সুযোগ তৈরি হলে কিছু শ্রমিকের অবস্থার উন্নতি সম্ভব।
গৃহশ্রমিকদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। যাঁরা অন্যের বাড়ি পরিষ্কার রাখেন, তাঁদের নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা যেন উপেক্ষিত না হয়। তাঁদের ‘কাজের লোক’ হিসেবে দেখার বদলে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। কারণ ঘরের কাজও কাজ; এর জন্য শ্রম দিতে হয়, দক্ষতা প্রয়োজন এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ গৃহশ্রমিকদের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা এবং আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে আইনি স্বীকৃতির সুফল পেতে বাস্তবায়নব্যবস্থা কার্যকর হওয়া জরুরি। লিখিত নিয়োগ, সহজ নিবন্ধন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা ছাড়া আইনি পরিবর্তনের সুফল সীমিত থেকে যেতে পারে।
এখানে সরকার, নিয়োগকর্তা, নাগরিক সমাজ ও গৃহশ্রমিকদের সংগঠনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগের শর্ত লিখিত করা, মজুরি ও কর্মঘণ্টা স্পষ্ট রাখা, ছুটি ও বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ও মাতৃত্বকালীন সময়ে কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যাবে, তা-ও পরিষ্কার করতে হবে।
‘হ্যান্ডস দ্যাট হোল্ড হোমস’-এর ১০ নারীর অভিজ্ঞতা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত উদ্যোগ তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অধিকার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রথম ধাপ; সেই অধিকার কাজে লাগাতে পারাই পরবর্তী পরীক্ষা।
যে হাত প্রতিদিন অন্যের ঘর সামলায়, সেই হাতের শ্রমের মূল্যও দিতে হবে, নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। গৃহশ্রমিকদের মর্যাদা রক্ষা কোনো দয়ার বিষয় নয়—এটি ন্যায়সংগত কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত।




