শরীয়তপুর সদর হাসপাতালকে ঘিরে দালালচক্রের তৎপরতা, বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী নেওয়া এবং সরকারি চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে কেন্দ্র করে রোগীদের হয়রানি এবং আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রোগীর স্বজনেরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, ছয়টি উপজেলা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি অংশকে নানা কথা বলে সরকারি হাসপাতাল থেকে আশপাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে যান। পাশাপাশি নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় কিছু চিকিৎসকের হাসপাতালে উপস্থিত না থাকা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখার অভিযোগও উঠেছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে হাসপাতালের আশপাশে একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেখা যায়। হাসপাতালের গেটের পূর্ব পাশে ফাতেমা ক্লিনিক, আল বারাকা হাসপাতাল, ডক্টরস পয়েন্ট ডায়াগনস্টিক, রূপসী বাংলা হাসপাতাল ও মেট্রো ক্লিনিকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটিতে প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় আলিম মৃধা, রনি সরদার, নয়ন মিয়া ও ময়না বেগমসহ কয়েকজনের অভিযোগ, সরকারি চিকিৎসকদের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের আস্থা অর্জনের পর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়। হাসপাতালের দেয়ালঘেঁষে ক্লিনিক গড়ে উঠলেও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও তারা দাবি করেন।
এদিকে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জনের কাছে জমা দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখা এবং চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারী গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর গ্রামের মো. ওয়াসিম সরদার। অভিযোগে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ডা. রফিকুল ইসলাম মামুন, তার স্ত্রী একই হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. ফাহমিদা নাজনীন এবং তার বোন নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ফারহান ডেইজীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, গত সোমবার বেলা ১টা ২০ মিনিটে ডা. রফিকুল ইসলাম মামুনের হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও তাকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখতে দেখা যায়। অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, ওই তিন চিকিৎসকের কেউ কেউ কর্মঘণ্টায় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন। এসব অভিযোগের সমর্থনে হাসপাতালের রেজিস্টার ও সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগে ডা. ফারহান ডেইজীর সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখা এবং চিকিৎসাগত যোগ্যতা উল্লেখের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
ডা. রফিকুল ইসলাম মামুন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা। আমি অফিসের সময় কোনো ক্লিনিকে যাইনি। এসব বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
ডা. ফারহান ডেইজীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, তিনি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীদের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি চিকিৎসকদের উপস্থিতি তদারকি এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর অনুমোদন ও সেবার মান যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।




