জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কয়েক দশকের অগ্রগতির পর বাংলাদেশে প্রজনন হার সামান্য বেড়েছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে দেশে মোট প্রজনন হার ছিল ২ দশমিক ৩। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৪। এই পরিবর্তন জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ গতিপথ, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি এবং জনসেবার প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রজনন হার মূলত বর্তমান বয়সভিত্তিক জন্মহারের ভিত্তিতে একজন নারীর প্রজননজীবনে সম্ভাব্য গড় সন্তানসংখ্যার পরিমাপ। ফলে ২ দশমিক ৪-এর অর্থ এই নয় যে ২০২৫ সালে প্রত্যেক নারী গড়ে ঠিক এতটি সন্তান জন্ম দিয়েছেন। একইভাবে, মাত্র ০ দশমিক ১ বৃদ্ধির তথ্য দিয়েই দেশে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ঘটছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। এর তাৎপর্য বুঝতে হলে অন্যান্য জনমিতিক সূচক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা দেখতে হবে।
পরিবর্তনের কারণ কোথায়?
বাংলাদেশ একসময় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, নারীর শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রজনন হার কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। ছোট পরিবার গঠনের ধারণা জনপ্রিয় হয় এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগও বাড়ে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তাই প্রশ্ন তুলছে, এসব অগ্রগতি কতটা টেকসই রয়েছে।
প্রজনন হারের পরিবর্তনে বিয়ের বয়স, নারীর শিক্ষাজীবনের দৈর্ঘ্য, কর্মসংস্থান, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ব্যবহার এবং সামাজিক রীতিনীতির ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু জরিপের একটি সামগ্রিক সংখ্যা থেকে কোনো একটি কারণকে দায়ী করা যায় না। এ জন্য অঞ্চল, বয়স, আয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
গ্রামাঞ্চলে হার বেশি
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় মোট প্রজনন হার ২ দশমিক ৫। শহরাঞ্চলে তা ২ দশমিক ২। এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে নীতিনির্ধারণে ভৌগোলিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর অসুবিধা, প্রশিক্ষিত কর্মীর পরামর্শের অভাব কিংবা প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহে বিঘ্ন সেবা গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি বিয়ের বয়স, শিক্ষার সুযোগ ও পরিবারের আর্থিক অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে। শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও বস্তিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও উপেক্ষা করা যাবে না। অতএব, শুধু জাতীয় গড়ের ওপর নির্ভর না করে কোন এলাকায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা শনাক্ত করে কর্মসূচি সাজানো জরুরি।
কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ
এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজারে ৯২টি জন্মের সমপর্যায়ের বয়সভিত্তিক প্রজনন হার পাওয়া গেছে। এটি ওই বয়সী নারীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের হারের সূচক; প্রতি এক হাজার কিশোরীর মধ্যে ৯২ জন মা হয়েছেন—এমন সরল হিসাব নয়।
কৈশোরে গর্ভধারণের সঙ্গে বাল্যবিবাহ, প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বাধার সম্পর্ক থাকতে পারে। অল্প বয়সে সন্তান নেওয়ার কারণে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ব্যাহত হওয়া, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কমে যাওয়া এবং কর্মজীবনে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।
মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা অপরিহার্য। তবে প্রজনন হার বৃদ্ধির তথ্য দিয়ে মাতৃমৃত্যু বা শিশুমৃত্যু বেড়েছে বলে দাবি করা যাবে না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মৃত্যুহার ও স্বাস্থ্যসেবার মান সম্পর্কে আলাদা তথ্য প্রয়োজন।
বাড়বে কি অর্থনৈতিক চাপ?
জনসংখ্যার পরিবর্তন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বিভিন্নভাবে। শিশুদের জন্য বিদ্যালয়, শিক্ষক, টিকাদান, পুষ্টি ও চিকিৎসার চাহিদা বাড়লে সরকারি সেবার পরিধিও বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ না থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাপ তৈরি হতে পারে।
পরিবারের জন্যও প্রতিটি শিশুর খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যয় বহন করতে হয়। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকলে পরিবারের সঞ্চয় কমতে পারে। সীমিত আয়ের পরিবারে শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সব পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক বোঝা নয়। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে তারা দেশের শ্রমশক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু জন্মের সংখ্যা নয়; বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করাও।
পরিবার পরিকল্পনায় কী করা দরকার?
পরিবার পরিকল্পনা সেবা কার্যকর করতে হলে শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী বিতরণ যথেষ্ট নয়। মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিশ্চিত করা, বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং ব্যক্তির পছন্দ অনুযায়ী সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বিশেষ করে নবদম্পতি, কিশোর-কিশোরী, গ্রামীণ নারী ও দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য সেবার সহজলভ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু নারীর ওপর না চাপিয়ে পুরুষদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। সন্তান নেওয়া বা না নেওয়া এবং সন্তান নেওয়ার সময় নির্ধারণে দম্পতির স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাসম্মত সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা, নারীর কর্মসংস্থান এবং মাতৃ ও শিশুসেবায় বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব উদ্যোগের ফলাফল মূল্যায়নে বিবিএস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য সমন্বয় করা প্রয়োজন।
সামনে নজরদারি জরুরি
বাংলাদেশের প্রজনন হার ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৪-এ ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক পরিবর্তন। তবে এর স্থায়িত্ব ও প্রকৃত কারণ জানতে পরবর্তী জরিপের ফল, জন্মনিবন্ধন এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবার তথ্যের সঙ্গে তুলনা করতে হবে।
জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য কেবল জন্মহার কমানো হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, নারীর শিক্ষা ও কর্মজীবনের সুযোগ এবং পরিবারগুলোর স্বেচ্ছায় প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যনির্ভর নীতি ও মানসম্মত সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই পরিবর্তন মোকাবিলা করতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিএস ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ জরিপের তথ্য এবং প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রাসঙ্গিক জনমিতিক সূচক।