নদীপথে দুর্গম জনপদে পৌঁছে যাচ্ছে চিকিৎসাসেবা। সৌদি আরবের সহযোগিতায় পরিচালিত পাঁচটি ভাসমান হাসপাতালের মাধ্যমে উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাখো মানুষ পেয়েছেন বিনামূল্যে চিকিৎসা।
নদী আর সমুদ্রঘেঁষা জনপদে বসবাস করলেও অনেক মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসা এখনো সহজলভ্য নয়। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সংকট ও চিকিৎসাকেন্দ্রের দূরত্ব তাদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমন বাস্তবতায় নদীপথে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ-সৌদি যৌথ উদ্যোগের ভাসমান হাসপাতাল প্রকল্প।
দেশের পাঁচটি বিশেষায়িত হাসপাতাল জাহাজের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৫১২ জন রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। এসব রোগীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে মোট ৯ লাখ ৬১ হাজার ৪০২ বার। ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ম্যানেজার (জনসংযোগ) জিলফুল মুরাদ শানু এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রকল্পটির আওতায় সর্বশেষ চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার শিবসা নদীতে। গত ২৮ অক্টোবর সেখানে একটি হাসপাতাল জাহাজ পৌঁছায়। পরে সোমবার স্থানীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আনুষ্ঠানিকভাবে এর চিকিৎসা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
সুন্দরবনসংলগ্ন গড়ইখালী ইউনিয়নসহ আশপাশের নদীবেষ্টিত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, এসব এলাকার মানুষের জন্য সাধারণ চিকিৎসা নিতে দূরের হাসপাতালে যাতায়াত করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন ব্যবস্থায় নদীর কাছেই চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে জাহাজটি আগামী তিন মাস শিবসা নদীতে অবস্থান করবে। এ সময়ে গড়ইখালীসহ আশপাশের এলাকার দরিদ্র ও চিকিৎসাসুবিধাবঞ্চিত মানুষ বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারবেন।
এই প্রকল্পের নাম ‘কিং আবদুল্লাহ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটাল’। প্রয়াত সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত এ কর্মসূচিতে অর্থায়ন করছে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)। সৌদি আরবের চ্যারিটি কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ।
২০২৩ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি হাসপাতাল জাহাজের মাধ্যমে দেশের দুর্গম নদী ও উপকূলীয় এলাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি জাহাজের রয়েছে আলাদা চিকিৎসা অবকাঠামো। বহরের সবচেয়ে বড় জাহাজটি ৩১ মিটার দীর্ঘ। এতে সাধারণ অস্ত্রোপচার ও চোখের চিকিৎসার জন্য দুটি আধুনিক অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। অন্য চারটি জাহাজের দৈর্ঘ্য ২৫ মিটার করে।
এসব হাসপাতালে চোখের ছানি অপারেশন, সাধারণ অস্ত্রোপচার, প্রসূতি ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, দাঁতের চিকিৎসা, পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা এবং বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। চিকিৎসক, নার্সসহ প্রায় ৩০ জন কর্মী ও নৌযান পরিচালনাসংশ্লিষ্ট সদস্য প্রতিটি জাহাজে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রকল্পের হাসপাতালগুলো শুধু খুলনা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় পর্যায়ক্রমে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। চাঁদপুর, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এসব জাহাজের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচটি হাসপাতালের মধ্যে কেএএপি-এমএইচবি-১ জাহাজটি ২০২৩ সালের জুনে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এটি বরগুনার আমতলীতে অবস্থান করছে। এ জাহাজ থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭১৬ জন রোগীকে ২ লাখ ৩ হাজার ৭৯৯ বার সেবা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের এপ্রিলে যাত্রা শুরু করা কেএএপি-এমএইচবি-৩ বর্তমানে পাবনার বেড়ায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এটির মাধ্যমে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৭৬ জন রোগী মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭২০ বার চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন।
একই বছরের এপ্রিলে কার্যক্রম শুরু করা কেএএপি-এমএইচবি-৪ জাহাজ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ২১৩ জন। তাদের মোট সেবার সংখ্যা ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯৪। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু করা কেএএপি-এমএইচবি-৫ বর্তমানে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে অবস্থান করছে।
পাইকগাছায় হাসপাতালটির কার্যক্রম চালু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও স্বস্তি দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম জানান, এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবারের পক্ষে দূরের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। নদীতে ভাসমান হাসপাতাল চালু হওয়ায় তাদের কাছাকাছি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরেক বাসিন্দা রাজ্জাক শেখের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোই অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারা পরিবারগুলোর জন্য বিনামূল্যের এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাসমান হাসপাতাল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যাতায়াতের অসুবিধার কারণে যারা এত দিন চিকিৎসা নিতে পারতেন না, তাদের জন্য এটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ আক্তার জানান, সৌদি সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পাঁচটি হাসপাতাল জাহাজ দেশের উপকূলীয় এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি বাগেরহাটের মোংলা ও খুলনার দাকোপ অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। বর্তমানে পাইকগাছায় অবস্থানরত জাহাজটির সেবাও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী তিন মাস অব্যাহত থাকবে।
নদী ও উপকূলনির্ভর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাসমান হাসপাতালগুলো একটি বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করেছে। তবে এ কার্যক্রমের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে নিয়মিত সেবা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও ওষুধের সরবরাহ এবং দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি। চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এমন জনগোষ্ঠীর কাছে নদীর বুকে গড়ে ওঠা হাসপাতালগুলো তাই হয়ে উঠেছে এক গুরুত্বপূর্ণ ভরসা।




