জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ফেনীতে এক ব্যতিক্রমী কর্মসূচির আয়োজন করেছে জেলা ছাত্রদল। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাতে শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি প্রতীকী আদালত বসিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছয় নেতার বিরুদ্ধে প্রতীকী মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। পরে আদালত চত্বরেই প্রতীকী ফাঁসির রায় কার্যকর করেন আয়োজকেরা।

ফেনী শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এই মূল কর্মসূচির আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানভিত্তিক দুর্লভ আলোকচিত্র প্রদর্শনী, নিহতদের স্মরণে বিশেষ দোয়া মাহফিল ও এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

প্রতীকী আদালতের বিচারকার্য:অনুষ্ঠানের আয়োজক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ মিনারের মূল বেদিতে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতীকী আদালত স্থাপন করা হয়েছিল। বিচারিক প্রক্রিয়া ফুটিয়ে তুলতে সেখানে প্রতীকী বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আসামিদের জন্য পৃথক কাঠগড়ার ব্যবস্থা করা হয়।

আদালতের বিচারকাজে রাষ্ট্রপক্ষ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার ওপর সংগঠিত গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের নৃশংস আলোকচিত্র ও বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে। উভয়পক্ষের উপস্থাপন শেষে প্রতীকী আদালত অভিযুক্ত শেখ হাসিনা, নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক এমপি আলাউদ্দিন নাসিম, সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল এবং পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজীর বিরুদ্ধে প্রতীকী মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) ঘোষণা করে। রায় ঘোষণার পর উপস্থিত নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতেই প্রতীকী ফাঁসি কার্যকরের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়।

রাজনৈতিক নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্য:প্রতীকী বিচার শেষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু তালেব বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ফেনীর মহিপালে যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তারা দ্রুত প্রকৃত আসামিদের বিচার দেখতে চান। জেলা ছাত্রদল আজ যে প্রতীকী বিচারের আয়োজন করেছে, ঠিক তেমনিভাবে বাস্তব আদালতেও দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন। মহিপালের গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনে আইনি সহায়তা দিয়ে জেলা বিএনপি সবসময় উদ্যোগ নেবে বলে তিনি জানান।

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার তাঁর বক্তব্যে সম্প্রতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা এক ভিডিও বার্তায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছেন এবং তাঁর দেখাদেখি নিজাম উদ্দিন হাজারীও দেশে ফেরার হুমকি দিচ্ছেন। তাদেরকে ইঙ্গিত করে ফরিদ বাহার বলেন, "বাংলাদেশে ঢোকার সবচেয়ে কাছের সীমান্ত এলাকা হচ্ছে বিলোনীয়া। আপনারা আসুন, আমরা সেখানে ফুল ও মালা নিয়ে অপেক্ষা করব। আপনারা এলে আপনাদের যথাযথ ‘মেহমানদারি’ করা হবে।"

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মহিপালে নিজাম উদ্দিন হাজারী ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, সে সময় ব্যবহৃত বহু অবৈধ অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন বাতিলকৃত লাইসেন্সের অস্ত্রও এখনো জমা নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে মহিপালসহ ফেনীর বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের মামলার বিচারপ্রক্রিয়া আশানুরূপ গতিতে এগোচ্ছে না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

উপস্থিত নেতৃবৃন্দ:ফেনী জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাহউদ্দিন মামুনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম মিলনের দক্ষ পরিচালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক এম এ খালেক, এয়াকুব নবী, গাজী হাবিবুল্লাহ মানিক, আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন বাবুল, সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া, জেলা যুবদলের সদস্যসচিব নঈম উল্লাহ চৌধুরী বরাত, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব এস এম কায়সার এলিন এবং জেলা বিএনপির সদস্য কামরুল হাসান মাসুদ।

এছাড়াও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি ফরহাদ উদ্দিন চৌধুরী মিল্লাত, যুগ্ম সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম দুলাল, শওকত আলী জুয়েল পাটোয়ারী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক জাকের হোসেন রিয়াদ পাটোয়ারীসহ বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা উক্ত কর্মসূচিতে অংশ নেন।