সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রাম এখন নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর। ভোরের আলো ফুটতেই ডানা মেলে উড়ে যায় শামুকখোলের দল। কেউ খাবারের সন্ধানে বের হয়, কেউ ফিরে আসে বাসায়। গ্রামের দীঘিপাড়ের গাছগুলোতে শত শত পাখির আনাগোনা আর ছানাদের কিচিরমিচিরে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। পাখির এই সমারোহ দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি এখন ‘পাখির গ্রাম’ নামে পরিচিত।
তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে চলনবিলের পূর্ব পাশে উলিপুর গ্রামের অবস্থান। গ্রামটির প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি দীঘিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পাখিদের নিরাপদ আবাস। কয়েক বছর ধরে দীঘিপাড়ের বটগাছসহ বিভিন্ন গাছে বাসা বাঁধছে শত শত শামুকখোল। ডিম ফুটে ছানা জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছর বাড়ছে পাখির সংখ্যা।
শামুকখোলের পাশাপাশি গ্রামটিতে দেখা যায় ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির, কোড়া, লালশির, বড় সরালি ও ছোট সরালিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। মাঠের আশপাশে রয়েছে ডাহুক, গাঙচিল, নানা প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, চখাচখি, কাদাখোঁচা, মাছরাঙা ও সারস। আছে আরও অনেক প্রজাতির পাখি, যেগুলোর নাম স্থানীয়দের অনেকেরই অজানা।
গ্রামবাসী আবদুস সামাদ বলেন, তিন-চার বছর আগে অল্প কয়েকটি শামুকখোল এসে এখানে বসবাস ও বাসা বাঁধতে শুরু করে। প্রতিবছর ডিম ফুটে ছানা জন্ম নেওয়ায় পাখির সংখ্যা বেড়েছে। এখন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ পাখি দেখতে আসেন।
স্থানীয় সজীব সরকার জানান, গ্রামের বাড়িঘরের আশপাশের গাছগুলোতে পাখিরা বাস করে। দিন-রাত তাদের বিচরণ দেখতে ভালো লাগে। অনেক দর্শনার্থী ছবি তোলেন, ভিডিও করেন। পাখিদের নিরাপত্তায় সরকারের আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন জীবনের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক নাসিম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাখি সংরক্ষণে কাজ করা ‘দ্য বার্ড সেফটি হাউস’-এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, উলিপুরের শামুকখোল এশীয় প্রজাতির পাখি এবং সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকাভুক্ত। পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ পাওয়ায় পাখিগুলো এখানে বসবাস ও বংশবিস্তার করছে। উঁচু গাছগুলো তাদের নিরাপদ আবাস হিসেবে কাজ করছে। তাই পাখির আবাসস্থল রক্ষায় গাছ কাটা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী শামুকখোলের প্রধান খাবার। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পাখি দেখা যায়। উপযুক্ত আবহাওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশের কারণে উলিপুরে পাখিগুলো বসতি গড়েছে।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানান, উলিপুরে পাখির উপস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জায়গাটিকে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ যেন পাখি হত্যা বা শিকার করতে না পারে, সে জন্য স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে।
প্রকৃতির এই অনন্য আবাস রক্ষায় স্থানীয়দের সচেতনতা, গাছ সংরক্ষণ এবং প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।




