ইসরায়েলের বিভিন্ন কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর রাবার বুলেট ছোড়া এবং গুরুতর আহত হওয়ার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। কয়েকটি ঘটনায় বন্দিদের অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে বলে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ। তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের পাঁচটি কারাগারে বন্দিদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ২১টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে দুটি মানবাধিকার সংগঠন। সংগঠন দুটি হলো ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস–ইসরায়েল এবং পাবলিক কমিটি এগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েল। সংগঠনগুলোর সংগ্রহ করা সাক্ষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো গোলযোগ ছাড়াই বন্দিদের কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে।
ব্যবহৃত গুলিতে রাবার বা প্লাস্টিকজাতীয় উপাদান ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে দক্ষিণ ইসরায়েলের কেতজিয়ত কারাগারে এক বন্দির আহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। গত জুনে গুলিবিদ্ধ ওই বন্দির চিকিৎসার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, আঘাতের কারণে তাঁর স্পর্শকাতর অঙ্গ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা অপসারণ করতে হয়। আইনজীবীর কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে ওই বন্দি দাবি করেন, এর আগে তল্লাশির সময় কারারক্ষীরা তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছিলেন। পরে তাঁর কক্ষে গুলি চালানো হলে তিনি আবারও গুরুতর আহত হন।
প্রচুর রক্তক্ষরণ হলেও তাঁকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। জুলাই মাসে একই কারাগারে আরেক বন্দির পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাবার বুলেটের আঘাতে তাঁর পায়ের নিচের অংশের হাড় ভেঙে যায় এবং পরে অস্ত্রোপচার করতে হয়। আরেক সাবেক বন্দি হারেৎজকে জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে মুক্তির পর তাঁকে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, বন্দিদের কক্ষ, কারাগারের খোলা প্রাঙ্গণ এবং আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষার স্থানেও গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে। গত আগস্টে তারা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানায়। বিশেষ করে কাছ থেকে কিংবা বদ্ধ স্থানে গুলি ছোড়ার কারণে গুরুতর ও প্রাণঘাতী আঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করে সংগঠন দুটি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি কারা বিভাগ এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, পরিস্থিতি এবং হুমকির মাত্রা বিবেচনা করেই তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইসরায়েলে নির্যাতনবিরোধী গণকমিটির আইনজীবী মেইরাভ বেন জিভের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক বন্দি নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে আগ্রহী হন না। অভিযোগ দায়েরের পরও কার্যকর আইনি পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠনটি। প্রতিবেদনে ইসরায়েলের কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৩৫০ ফিলিস্তিনি বন্দি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৫০ শিশু ও ৯০ নারী রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বন্দিদের ওপর নির্যাতন, খাদ্যসংকট এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও তুলেছে। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব ছাড়া প্রতিটি ঘটনার দায় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।




