দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার ক্ষমতায় থেকেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বিএনপি। আজ দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতি হওয়া জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে দলটি। বিশেষ করে প্রয়াত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একাধিকবার সরকার গঠন করে বিএনপি। তবে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আশির দশকে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের সময় দলটি কয়েক দফা ভাঙনের মুখে পড়ে।বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতে, সবচেয়ে কঠিন সময়টি এসেছে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে। এর আগে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও দলটি বড় সংকটে পড়েছিল। কিন্তু এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়নি।
একদিকে দলের চেয়ারপার্সন কারাগারে, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে—এমন অবস্থাতেও সাংগঠনিকভাবে টিকে থেকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮১ সালে এক সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর পুরো আশির দশকজুড়ে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপি একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়েছিল। কিন্তু ২০০৭ সালের পর ১৭ বছর ধরে আরও বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হলেও এবার দলটির বড় ধরনের ভাঙন দেখা যায়নি।
ক্ষমতায় আসা ও হারানোর ধারাবাহিকতা
জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের মার্চে ক্ষমতা ছাড়তে হয় দলটিকে।এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। ওই নির্বাচনে জোটটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল।তবে সেই সরকারের সময়ই তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা এবং বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের উত্থানসহ বেশ কিছু ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয় সংবিধান সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করার পর। সমালোচকদের অনেকে মনে করেছিলেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
রাজনৈতিক সংকটের ধারাবাহিকতায় অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর ২০০৬ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নেন।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর রাজনৈতিক সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ কার্যত শেষ হয়ে যায়।
নেতারা কারাগারে, তারেক রহমান বিদেশে
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে কারাগারে নেওয়া হয়। দুই দলের আরও অনেক নেতাকেও আটক করা হয়।ওই সময় আটক হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে যান তারেক রহমান। এরপর পুরো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি আর দেশে ফেরেননি।২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়। বিপরীতে বিএনপি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।
পরে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করলে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি কয়েকটি দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে অংশ নেয়।তবে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি। এরপর ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশ নেয়নি।
খালেদা জিয়ার কারাবাস ও নেতৃত্বের সংকট
রাজনৈতিক কর্মীদের মতে, বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি ছিল ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতির একটি মামলায় সাজা দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো।বিশ্লেষকদের মতে, ওই ঘটনার বিরুদ্ধে বিএনপি খুব একটা কার্যকর প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। এর পর থেকেই লন্ডনে অবস্থান করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন তারেক রহমান।পরে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাসায় অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের কয়েক ঘণ্টা পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তাঁর চূড়ান্ত মুক্তি ঘটে।
এরপর গত ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এর কয়েকদিন আগেই তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের প্রায় দুই মাস আগে গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁর দেশে ফেরার ঘটনা ঘটে। পরে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে।
মামলা, গুম ও হত্যার অভিযোগ
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির প্রায় ৪০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৬০০ নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে এবং সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে বলেও দলটি দাবি করে।তবে এসব অভিযোগ ও পরিস্থিতির মধ্যেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মতো রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপি নিজস্ব আন্দোলনের মাধ্যমে তৈরি করতে পারেনি বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।দুটি নির্বাচন বর্জন, একটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে তা প্রত্যাখ্যান, চেয়ারপার্সনের কারাবাস এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্বাসন—সব মিলিয়ে দলটি অত্যন্ত কঠিন সময় পার করেছে।
বিএনপি এককভাবে বহুবার আন্দোলনের কর্মসূচি দিলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির নিজস্ব আন্দোলন বা সরকার পতনের ডাক খুব একটা জোরালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
কীভাবে টিকে রইল বিএনপি?
দেড় দশকেরও বেশি সময়ের এই প্রতিকূলতা বিএনপি কীভাবে সামাল দিল—এ প্রশ্নের জবাবে দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা দলকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।তিনি বলেন, “আসলে শুরু থেকেই দলটির নীতি ও আদর্শ দেশের মানুষ পছন্দ করেছে। খালেদা জিয়া স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দলটিকে তৃণমূলে নিয়ে গেছেন। তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়েছেন। কখনো কখনো নানা ভুলভ্রান্তি হলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি জনগণের সঙ্গে ছিল। ফলে কঠিন সময়েও দল আর ভাঙ্গনের মুখে পড়েনি, দলীয় সংহতি অটুট ছিল।”
মোশাররফ হোসেনের মতে, বিএনপির শুরুর দিকের অনেক নেতা বিভিন্ন দল বা পেশা থেকে এসেছিলেন এবং তাঁদের অনেকে পরবর্তীতে দল ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু গত ১৭ বছরে বিএনপির মূল শক্তি তৈরি হয়েছে দলের ছাত্র ও যুব সংগঠন থেকে উঠে আসা নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের মাধ্যমে।
তাঁর দাবি, এই প্রজন্মের নেতাকর্মীরাই দলীয় ঐক্য ধরে রেখেছেন এবং দল ভাঙার বিভিন্ন প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছেন। ফলে সংকট থেকে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এই ঐক্য বড় ভূমিকা রেখেছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, একটি রাজনৈতিক দলের ঐক্য নির্ভর করে কর্মীরা দলের আদর্শের বিষয়ে কতটা দৃঢ় তার ওপর।তিনি বলেন, বিএনপিতে সেই আদর্শিক সংহতি তৈরি হয়েছে। সরকারের কঠোর দমননীতি ও বৈরিতার মধ্যেও নেতাকর্মীরা তাঁদের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। তাঁর মতে, সরকারের বৈরিতাই বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কঠিন পরিস্থিতিতেও ঐক্যবদ্ধ থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
এ পরিস্থিতি দলটিকে একদিকে সতর্ক করেছে, অন্যদিকে সাংগঠনিকভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে বলে মনে করেন তিনি। ফলে কঠিন সময় অতিক্রম করে বিএনপি শেষ পর্যন্ত মানুষের ভোটে ক্ষমতায় ফিরতে পেরেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদও মনে করেন, গত ১৭ বছরে বিএনপি এমন পরিস্থিতির মধ্যে ছিল, যে পরিস্থিতিতে সাধারণত একটি রাজনৈতিক দল ভেঙে যেতে পারে। এরশাদ আমলে দলটি ভেঙেছিল, কিন্তু এবার তা হয়নি।
তাঁর মতে, তখন দলের মূল নেতৃত্ব কার্যত অনুপস্থিত ছিল—চেয়ারপার্সন ছিলেন কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন নির্বাসনে। এমন অবস্থায় বিএনপিকে টিকিয়ে রাখার পেছনে দলের মধ্যপন্থী বৈশিষ্ট্য ভূমিকা রেখেছে।
মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, আওয়ামী লীগ ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মাঝখানে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির একটি চাহিদা ছিল এবং এখনো রয়েছে। বিএনপিও বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। এ কারণেই দলটি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে পেরেছে।
ফরিদপুরের বিএনপি সমর্থক মিরাজুল হাসান স্কুলজীবন থেকেই ছাত্রদলের সমর্থক। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন। মাঝে মধ্যে বিএনপির সভা-সমাবেশেও অংশ নেন তিনি।মিরাজুল হাসানের মতে, গত ১৭ বছরে বিএনপি বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। ক্ষমতা হারানোর পর চরম বিপর্যয়ে পড়া এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার ক্ষমতায় আসার অভিজ্ঞতা দলটি অর্জন করেছে।তিনি মনে করেন, বিএনপি এখন একটি ‘বিএনপি প্রজন্মের’ দলে পরিণত হয়েছে। দলের সর্বোচ্চ পর্যায়েও ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব জায়গা করে নিয়েছে।
দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার ক্ষমতায় থেকেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বিএনপি। আজ দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতি হওয়া জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বা
প্রিয় বাংলাদেশরাজনীতি


