আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে নয় দফা সুনির্দিষ্ট লিখিত দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পুরো কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে দলটির কেন্দ্রীয় সচিবালয় ও নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত প্রতিনিধিদল এসব দাবি তুলে ধরে।বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিশনের কাছে নয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে। তবে কয়েকটি বিষয়ে কমিশনের ‘অসহায়ত্ব’ প্রকাশের বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন কমিশন কোনো বিশেষ দলীয় সরকারের চাপের মধ্যে কাজ করছে কি না।

জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি হলো—বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ যে সিদ্ধান্ত রয়েছে, তা অবিলম্বে বাতিল করা।গোলাম পরওয়ার বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের শিক্ষকরা জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি রাজনীতি ও ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছেন। এমনকি সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাঁরা অংশ নিয়েছেন।

তাঁর মতে, এমন অবস্থায় শুধু স্থানীয় নির্বাচনে শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে থাকা নাগরিকদের সমানাধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি একটি স্পষ্ট বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বলেও দাবি করেন তিনি।এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে নির্বাচন কমিশনকে জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় বিষয়টি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জামায়াত।দলটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো—যেসব রাজনৈতিক দলের রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকার নিষিদ্ধ করেছে, সেসব দলের পদ-পদবিধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়া।

জামায়াতের যুক্তি, কোনো নিষিদ্ধ দলের পদধারী ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিলে সেটিও এক ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং বিষয়টি সাধারণ মানুষের ধারণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই স্বচ্ছতার স্বার্থে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়েছে। তবে সাধারণ সমর্থকদের জন্য কোনো নিষেধাজ্ঞার দাবি জানায়নি দলটি।বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানায় জামায়াত।গোলাম পরওয়ারের দাবি, শামসুল আলম সরাসরি বিএনপির নির্বাচন বিষয়ক সাব-কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর মতে, এমন একজন ব্যক্তির নিয়োগ সংবিধান ও নিরপেক্ষ নির্বাচনি ব্যবস্থার পরিপন্থি।

এ বিষয়ে আগের বৈঠকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর দাবি, কমিশন তাঁদের উদ্বেগের সত্যতা স্বীকার করলেও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ না হওয়ায় বিষয়টি সরকারকে জানানোর প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এমন রাজনৈতিক নিয়োগ দ্রুত বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোতে সম্প্রতি দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগেরও প্রতিবাদ করেছে জামায়াত।দলটির অভিযোগ, সরকারি অর্থ, এডিপি বরাদ্দ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে আসন্ন নির্বাচনে দলীয় সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই এসব ব্যক্তিকে প্রশাসকের পদে বসানো হয়েছে।

নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এসব পদে থাকা প্রশাসকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি জানিয়েছে দলটি। এমনকি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কেউ প্রশাসকের পদ থেকে পদত্যাগ করলেও তাঁকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার নিয়ম চালুর দাবি জানানো হয়েছে।একই সঙ্গে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তির নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণ বন্ধ করতে কঠোর আচরণবিধি প্রণয়নের দাবিও জানিয়েছে জামায়াত।বৈঠক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, কমিশন কিছু বিষয়ে একমত হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় তারা অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছে। তবে জনদাবি ও সিভিল সোসাইটির পর্যালোচনার মুখে কমিশন এসব দাবি মানতে বাধ্য হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।

স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গেও অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যেহেতু স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না, তাই দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে না। আগ্রহী ব্যক্তিরা নিজ নিজ এলাকায় স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনের জন্য গঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই ঐক্য কেবল জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই গঠিত। স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলো নিজেদের মতো করে অংশ নেবে; এ ক্ষেত্রে কোনো দলগত সমঝোতা বা বাধ্যবাধকতা থাকবে না।