দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভালভ পরীক্ষার ফল অনুমোদনের পর কমিশনিং কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সফলভাবে সম্পন্ন হলে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে উৎপাদনের নির্দিষ্ট সময় নির্ভর করছে কমিশনিংয়ের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের সংযোজন ঘটবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিরাপত্তা ভালভের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় কমিশনিং কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটে। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা শেষে ফলাফল নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফল অনুমোদন করা হয়েছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ভালভ গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। নির্ধারিত চাপের মধ্যে এটি সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। চুল্লি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের পরীক্ষা অপরিহার্য। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফল অনুমোদন মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত অনুমতি নয়। এর পরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
এসব ধাপের মধ্যে অন্যতম ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, তাপ উৎপাদন বৃদ্ধি, টারবাইন চালু এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করা হবে। প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা মান ও কারিগরি শর্ত পূরণ করতে হবে। সব পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সময় প্রকৃত উৎপাদন কত হবে, তা নির্ভর করবে কমিশনিংয়ের ফলাফল, কেন্দ্রের কার্যক্ষমতা এবং গ্রিডের প্রস্তুতির ওপর। ফলে সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা ও বাস্তবে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
রূপপুরের গুরুত্ব শুধু জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস, তেল ও কয়লাসহ বিভিন্ন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হলে উৎপাদনের উৎস আরও বহুমুখী হবে। এতে জ্বালানির উৎসের ওপর চাপ বণ্টন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কেন্দ্রটির নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনা, উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যকারিতার ওপর।
দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে রূপপুর কেন্দ্র দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে পারে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি হিসাব অনুযায়ী, এ অবদান প্রায় ১০ শতাংশ হতে পারে। তবে বিদ্যুতের মোট চাহিদা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে। তাই প্রকৃত অবদান নির্ধারিত হবে কেন্দ্রের উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণকাল, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা এবং দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার ওপর।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও রূপপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা কমানো গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে। তবে শুধু নতুন উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত হলেই শিল্প খাতের সব বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান হবে না। সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্রিডের স্থিতিশীলতা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি প্রকল্পটির ব্যয় ও পরিচালনব্যবস্থাও বিবেচনায় রাখতে হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর সঙ্গে রয়েছে ঋণ পরিশোধ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়। ফলে রূপপুর চালু হলেই বিদ্যুতের দাম কমে যাবে কিংবা জ্বালানি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। অর্থনৈতিক লাভ নির্ভর করবে উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যয়, ব্যবহার এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ওপর।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও রূপপুর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় দক্ষ প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে দেশীয় জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। তবে এ ধরনের সক্ষমতা ধরে রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং নিরাপত্তা সংস্কৃতির ধারাবাহিক উন্নয়ন জরুরি।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, তেল বা গ্যাসের মতো জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ তৈরি করা হয় না। ইউরেনিয়ামের পরমাণু বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশনের মাধ্যমে উৎপন্ন তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এ কারণে পরিচালন পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ তুলনামূলক কম। তবে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে যায়।
রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ধারণা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটমের মাধ্যমে ১২৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছিল। তবে সে সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন সমীক্ষা, নীতিগত উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পরিকল্পনাটি এগিয়ে যায়।
২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০০৭ সালে দুটি ৫০০ মেগাওয়াট ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক শর্ত তদারক করা। কেন্দ্রটির প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার জন্য অপরিহার্য।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রূপপুর কেন্দ্রের পরিচালন আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। তবে এত দীর্ঘ সময় নিরাপদে পরিচালনার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কার, পর্যায়ক্রমে জ্বালানি পরিবর্তন এবং ব্যবহৃত জ্বালানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনকাল বাড়ানোর বিষয়টিও নির্ভর করবে নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর।
সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় একটি সংযোজন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রথম ইউনিটের কমিশনিংয়ে অগ্রগতি সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কেবল উৎপাদন শুরুর মধ্য দিয়ে নয়; বরং নিরাপদ পরিচালনা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং দেশের অর্থনীতিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে।