সময় পেরিয়ে যায়, বদলে যায় পৃথিবী; কিন্তু মানুষের কর্ম ও অবদান তাকে বাঁচিয়ে রাখে ইতিহাসের পাতায়। ৭ নভেম্বর এমনই কয়েকজন স্মরণীয় ব্যক্তির প্রয়াণদিন। রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র ও ক্রীড়াঙ্গনে অবদান রাখা এসব ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম আজও মানুষের কাছে স্মরণীয়। বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ তাদের স্মরণে আজকের এই আয়োজন।
যারা এই দিনে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন:
খালেদ মোশাররফ (১৯৩৭–১৯৭৫) — বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকায় নিহত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নাম বিশেষভাবে আলোচিত। 
এ টি এম হায়দার (১৯৪২–১৯৭৫) — বীর উত্তম ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর নিহত হন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ নম্বর সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। সম্মুখযুদ্ধে সাহসিকতা ও নেতৃত্বের জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাব লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
অশ্বিনীকুমার দত্ত (১৮৫৬–১৯২৩) — শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। ১৯২৩ সালের ৭ নভেম্বর প্রয়াত হন বরিশালের কৃতী সন্তান অশ্বিনীকুমার দত্ত। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সমাজসেবক ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। বরিশালে ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও ব্রজমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। শিক্ষা বিস্তার ও সমাজকল্যাণে তার অবদান আজও স্মরণীয়।
নবনীতা দেবসেন (১৯৩৮–২০১৯) — ভারতীয় কবি ও সাহিত্যিক। ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি ও শিশুতোষ সাহিত্যে তিনি রেখেছেন সমৃদ্ধ অবদান। সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং ২০০০ সালে পদ্মশ্রী সম্মাননা লাভ করেন। বাংলা সাহিত্যে তার সৃজনশীলতা ও স্বতন্ত্র লেখনশৈলী বিশেষ স্থান দখল করে আছে। 
বাহাদুর শাহ জাফর (১৭৭৫–১৮৬২) — মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট। ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর রেঙ্গুনে নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বাহাদুর শাহ জাফর। তিনি ছিলেন ভারতের শেষ মুঘল সম্রাট এবং উনিশ শতকের একজন উল্লেখযোগ্য উর্দু কবি। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রতীকী নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে বন্দি করে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তার মৃত্যু মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
জো ফ্রেজিয়ার (১৯৪৪–২০১১) — মার্কিন কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা। ২০১১ সালের ৭ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন বিশ্বখ্যাত হেভিওয়েট বক্সার জো ফ্রেজিয়ার। ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকে হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক জয় করেন তিনি। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে তার ঐতিহাসিক লড়াইগুলো বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
৭স্টিভ ম্যাককুইন (১৯৩০–১৯৮০) — হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা। ১৯৮০ সালের ৭ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন মার্কিন চলচ্চিত্র অভিনেতা স্টিভ ম্যাককুইন। ষাট ও সত্তরের দশকে হলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। ‘দ্য গ্রেট এস্কেপ’, ‘বুলিট’ ও ‘প্যাপিলন’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন। স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী ও পর্দায় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ‘কিং অব কুল’ নামে পরিচিত ছিলেন।
আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (১৮২৩–১৯১৩) — ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ ও বিজ্ঞানী। ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস। প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের বিকাশে চার্লস ডারউইনের পাশাপাশি তারও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। জীববৈচিত্র্য, প্রাণীর ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও বিবর্তন নিয়ে তার গবেষণা বিজ্ঞানজগতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক হিসেবে স্বীকৃত।
প্রতিটি মানুষের জীবন একসময় থেমে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কর্ম ও আদর্শ সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। ৭ নভেম্বর প্রয়াত এসব ব্যক্তিত্বের কেউ দেশ ও মানুষের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, কেউ শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, আবার কেউ সাহিত্য, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র ও ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস জানার পাশাপাশি অনুপ্রেরণারও উৎস হয়ে থাকবে।