ইতিহাসের পাতায় ৭ নভেম্বর একটি উল্লেখযোগ্য দিন। এ দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির জগতে অবদান রাখা দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তি। বাংলাদেশ ও ভারতের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এ দিনের কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষের নাম। তাদের কর্মময় জীবন ও অবদান নিয়ে আজকের আয়োজন।
জন্মদিনের তালিকা ও কর্মময় জীবন-
আমিনুল ইসলাম (১৯৩১–২০১১) — বাংলাদেশি চিত্রশিল্পী। বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার বিকাশে আমিনুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। চিত্রকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে একুশে পদক এবং ১৯৮৮ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫৮–১৯৩২) — উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। ১৮৫৮ সালের ৭ নভেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার পৈল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বিপিনচন্দ্র পাল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। লালা লাজপত রায় ও বাল গঙ্গাধর তিলকের সঙ্গে তিনি ‘লাল-বাল-পাল’ নামে পরিচিত রাজনৈতিক ত্রয়ীর অংশ ছিলেন। সাংবাদিক, লেখক ও প্রভাবশালী বক্তা হিসেবেও তার বিশেষ পরিচিতি ছিল।
সি ভি রমন (১৮৮৮–১৯৭০) — ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী। ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন ১৮৮৮ সালের ৭ নভেম্বর তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। আলোর বিক্ষেপণ নিয়ে তার যুগান্তকারী আবিষ্কার ‘রমন ইফেক্ট’ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। বিজ্ঞানে নোবেলজয়ী প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয়।
কমল হাসান (১৯৫৪–বর্তমান) — ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা। ১৯৫৪ সালের ৭ নভেম্বর ভারতের তামিলনাড়ুর পরমাক্কুডিতে জন্মগ্রহণ করেন কমল হাসান। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্য রচনা, চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনায়ও তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তামিল, তেলেগু, হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন।
৫. অনুষ্কা শেঠি (১৯৮১–বর্তমান) — ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ১৯৮১ সালের ৭ নভেম্বর কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণ করেন অনুষ্কা শেঠি। মূলত তেলেগু ও তামিল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। ‘বাহুবলী’ চলচ্চিত্রে দেবসেনা চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। অভিনয় দক্ষতা ও পর্দায় শক্তিশালী উপস্থিতির কারণে তিনি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখ।
মেরি কুরি (১৮৬৭–১৯৩৪) — নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী। পোল্যান্ডের ওয়ারশতে ১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মেরি কুরি। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তার গবেষণা বিজ্ঞানজগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। পিয়েরে কুরির সঙ্গে যৌথ গবেষণায় পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন—দুই ভিন্ন শাখায় নোবেল পুরস্কার অর্জন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এই বিজ্ঞানী।
আলবেয়ার কামু (১৯১৩–১৯৬০) — ফরাসি সাহিত্যিক ও দার্শনিক। ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর আলজেরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ফরাসি সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও দার্শনিক আলবেয়ার কামু। মানুষের অস্তিত্ব, জীবনের অর্থ, নৈতিকতা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন তার সাহিত্যকর্মে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ ও ‘দ্য প্লেগ’ তার বিখ্যাত উপন্যাস। ১৯৫৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তিনি।
জনি মিচেল (১৯৪৩–বর্তমান) — কানাডীয় সংগীতশিল্পী ও গীতিকার। ১৯৪৩ সালের ৭ নভেম্বর কানাডায় জন্মগ্রহণ করেন জনি মিচেল। সংগীতের নিজস্ব ধারা, ব্যতিক্রমী কণ্ঠ এবং গভীর অর্থবহ গীতিকবিতার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ফোক, জ্যাজ ও পপ সংগীতে তার অবদান সংগীতজগতে বিশেষ স্থান তৈরি করেছে। একাধিক গ্র্যামি পুরস্কারজয়ী এই শিল্পী আধুনিক জনপ্রিয় সংগীতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
একটি দিনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব মানুষের জীবন ও কর্মের পরিধি ভিন্ন হলেও তাদের সবার মধ্যে রয়েছে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের স্বাক্ষর। কেউ বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন, কেউ সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন, আবার কেউ স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জন্মদিনের এই স্মরণ তাঁদের কর্ম ও কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।