রাতের খাবার শেষে একই ঘরে বসে আছেন স্বামী-স্ত্রী। অথচ দুজনের মনোযোগ মুঠোফোনের পর্দায়। কথাবার্তা কমছে, বাড়ছে সন্দেহ ও মানসিক দূরত্ব। কখনো এই দূরত্ব গড়ায় গোপন যোগাযোগ, আবেগের বিচ্ছিন্নতা কিংবা দাম্পত্য সংকটে।
তবে মুঠোফোন নিজে কোনো সম্পর্ক ভাঙে না। সমস্যা তৈরি হয় যখন প্রযুক্তির ব্যবহার সঙ্গীর প্রতি অবহেলা, অসততা কিংবা সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়াল করার মাধ্যম হয়ে ওঠে। সামনে থাকা মানুষটিকে উপেক্ষা করে ফোনে ডুবে থাকার প্রবণতাকে বলা হয় ‘ফাবিং’। সম্পর্কবিষয়ক আলোচনায় এ আচরণকে দাম্পত্যে অসন্তোষের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দাম্পত্যে আস্থা গড়ে ওঠে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং পরস্পরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু একসঙ্গে থেকেও দুজন আলাদা জগতে ডুবে থাকলে সেই যোগাযোগ দুর্বল হতে পারে। রাত জেগে ব্যক্তিগত আলাপ, ফোনের ব্যবহার নিয়ে অস্পষ্টতা কিংবা আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন সন্দেহ তৈরি করতে পারে। আবার সেই সন্দেহ থেকে শুরু হতে পারে ফোন তল্লাশি, পাসওয়ার্ড দাবি ও অনাকাঙ্ক্ষিত নজরদারি। এতে সমস্যার সমাধান না হয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।
একটি বেসরকারি সমীক্ষায় ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারকে সঙ্গীর সঙ্গে তিক্ততার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৬৭ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে ফোনে ব্যস্ত থাকেন। তবে সমীক্ষাটির নমুনা, পদ্ধতি ও প্রকাশনার তথ্য যাচাই ছাড়া এই পরিসংখ্যানকে সব দম্পতির অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
গোপন সম্পর্কের সূচনা সব সময় শারীরিক ঘনিষ্ঠতা দিয়ে হয় না। কখনো পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীর সঙ্গে নিয়মিত ব্যক্তিগত আলাপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে আবেগের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত দুঃখ, দাম্পত্যের অসন্তোষ ও অনুভূতির কথা তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। যোগাযোগ গোপন করা, বার্তা মুছে ফেলা কিংবা সঙ্গীর কাছ থেকে সম্পর্কের প্রকৃতি আড়াল করার মধ্য দিয়ে তৈরি হতে পারে বিশ্বাসের সংকট।
তবে প্রত্যেক ব্যক্তিগত যোগাযোগই পরকীয়া নয়। বন্ধুত্ব, পেশাগত সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত পরিসরের অধিকার রয়েছে। সমস্যা তখনই গুরুতর হয়, যখন যোগাযোগটি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়, দাম্পত্যের সম্মত সীমারেখা লঙ্ঘিত হয় কিংবা সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের জায়গা অন্য কারও কাছে ক্রমে সরে যেতে থাকে।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাকিব ও তাঁর স্ত্রী মৌয়ের ঘটনায় এমন সংকটের চিত্র দেখা যায়। পরিচয় গোপন রাখতে তাঁদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। কাজের প্রয়োজনে রাকিব দিনের বড় অংশ ফোনে ব্যস্ত থাকতেন। প্রথমদিকে মৌ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই নিলেও পরে লক্ষ করেন, রাকিব রাতে অন্য ঘরে গিয়ে ফোন ব্যবহার করেন এবং প্রশ্ন করলে বিরক্ত হন। একসময় মৌ জানতে পারেন, এক সহকর্মীর সঙ্গে রাকিবের নিয়মিত ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে। নিজের দাম্পত্যের অসন্তোষও তিনি ওই সহকর্মীর সঙ্গে ভাগ করতেন।
মৌয়ের কষ্টের কারণ শুধু ওই যোগাযোগ ছিল না; স্বামীর সঙ্গে যে কথাগুলো তাঁর ভাগ করে নেওয়ার কথা, সেগুলো অন্য কারও কাছে চলে যাওয়াও তাঁকে আঘাত করেছিল। পরিবারের সহায়তায় তাঁরা নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। যোগাযোগের সীমারেখা নির্ধারণ ও নিয়মিত কথোপকথনের মাধ্যমে সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে এমন কেস থেকে সব দাম্পত্য সংকটের কারণ বা সমাধান সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের এক দম্পতির ক্ষেত্রে সন্দেহ থেকেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। স্ত্রী স্বামীর ফোন পরীক্ষা করতেন, আর স্বামী স্ত্রীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাসওয়ার্ড চাইতেন। পরে দেখা যায়, স্ত্রীর গোপন সম্পর্ক ছিল না; তিনি কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু নিয়মিত জেরা ও ফোন তল্লাশির কারণে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। ঘটনাটি দেখায়, প্রমাণ ছাড়া নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণও দাম্পত্যের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
রাজশাহীর আরেক দম্পতির ক্ষেত্রে কলেজজীবনের এক বন্ধুর সঙ্গে স্বামীর পুনরায় যোগাযোগ থেকে আবেগগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। স্বামী সেটিকে মানসিক সমর্থন হিসেবে দেখলেও স্ত্রী অনুভব করেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অন্য একজনের সঙ্গে ভাগ করা হচ্ছে। শারীরিক সম্পর্ক না থাকলেও কোনো গোপন আবেগগত সম্পর্ক সঙ্গীর কাছে বিশ্বাসভঙ্গের মতো মনে হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুজনের প্রত্যাশা, সম্পর্কের সীমারেখা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ।
দাম্পত্যে গোপন যোগাযোগের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে—দীর্ঘদিনের একাকিত্ব, অবহেলা, প্রশংসা বা মানসিক সমর্থনের অভাব, দাম্পত্য কলহ থেকে পালানোর প্রবণতা কিংবা অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে নতুনত্বের আকর্ষণ। তবে এসব কারণ প্রতারণার অজুহাত নয়। সম্পর্কের সমস্যা থাকলে সৎ আলোচনা, পরামর্শ কিংবা প্রয়োজনে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়; গোপন যোগাযোগ সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
দাম্পত্যের দ্বন্দ্বের প্রভাব সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপরও পড়তে পারে। ঘন ঘন ঝগড়া, নীরবতা ও উত্তেজনা শিশুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। আবার ক্ষোভ থেকে ব্যক্তিগত ছবি বা বার্তা প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান কিংবা হুমকি দেওয়ার মতো আচরণ নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। তাই সম্পর্কের সংকটে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নিয়ে প্রয়োজনে বিশ্বস্ত স্বজন, দাম্পত্য পরামর্শক বা আইনগত সহায়তা নেওয়া উচিত।
সমাধানের প্রথম ধাপ হলো অভিযোগের বদলে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা। প্রতিদিন কিছু সময় ফোন সরিয়ে রেখে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা, ফোন ব্যবহারের বিষয়ে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য নিয়ম নির্ধারণ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। সন্দেহ হলে গোপনে ফোন তল্লাশি না করে সরাসরি আলোচনা করা ভালো। বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পেশাদার পরামর্শ সহায়ক হতে পারে।
মুঠোফোন দাম্পত্যের একমাত্র শত্রু নয়; এটি যোগাযোগের মাধ্যম। সেই মাধ্যম কখনো সম্পর্ককে কাছে আনে, কখনো ভুল ব্যবহার ও অবিশ্বাসের কারণে দূরত্ব বাড়ায়। তাই সংসার ভাঙনের জন্য শুধু প্রযুক্তিকে দায়ী না করে দেখতে হবে, দুজন কি একে অপরকে সময় দিচ্ছেন, মনোযোগ দিয়ে শুনছেন এবং সম্পর্কের প্রতি সৎ থাকছেন? কারণ অনেক সময় সংকটের শুরু হয় ফোনের পর্দায় নয়, সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা নীরবতায়।




