একটি শিশু নির্যাতন, দারিদ্র্য, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ কিংবা সামাজিক চাপের মুখে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু সেই সংকটের সমাধান হিসেবে শিশুর বিয়েকে বিশেষ অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ কতটা যুক্তিসংগত? বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ১৯ ধারা এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসে। ধারাটিতে নির্দিষ্ট শর্তে বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়েকে আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার সুযোগ রয়েছে। শিশুর সুরক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি আইনে এমন ব্যতিক্রম কতটা প্রয়োজনীয়, তা নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি।
আইনের ৫ ধারায় বাল্যবিবাহ বন্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ৭ থেকে ৯ ধারায় বাল্যবিবাহে অংশ নেওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক, অভিভাবক এবং বিয়ে সম্পাদনকারীর জন্য শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ১৯ ধারায় আদালতের নির্দেশ, অভিভাবকের সম্মতি ও অপ্রাপ্তবয়স্কের ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ বিবেচনার শর্তে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। ফলে আইনের প্রতিরোধমূলক অবস্থানের পাশাপাশি এমন একটি সুযোগ রয়েছে, যার প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ পরিস্থিতি কী, তা আইনে পূর্ণাঙ্গভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। ২০১৮ সালের বিধিমালায় আবেদন, অনুসন্ধান কমিটির মতামত এবং আদালতের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু প্রক্রিয়া নির্ধারণ আর সিদ্ধান্তের মানদণ্ড স্পষ্ট করা এক বিষয় নয়। শিশুর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মতামত ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত স্পষ্টতা না থাকলে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সর্বোত্তম স্বার্থ’ কার বিবেচনায়?
শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার সামগ্রিক অধিকার ও বিকাশকে গুরুত্ব দিতে হয়। কেবল পরিবার বা সমাজের তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করাই এর উদ্দেশ্য হতে পারে না। একটি শিশু কী চায়, সে নিরাপদ কি না, তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না, সে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকিতে রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকের সম্মতি থাকলেই শিশুর স্বাধীন সম্মতি নিশ্চিত হয় না। বিশেষত পরিবার ও সমাজের চাপ যখন প্রবল, তখন শিশুর প্রকৃত মতামত প্রকাশের সুযোগ সীমিত হতে পারে। আদালতের অনুমোদন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা হলেও সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও মানদণ্ড যথেষ্ট পরিষ্কার না হলে তা সব ঝুঁকি দূর করতে পারে না।
সমাজে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, যৌন নির্যাতন কিংবা সামাজিক বদনামের আশঙ্কায় শিশুর বিয়েকে সমাধান হিসেবে দেখা হয়। অথচ নির্যাতনের শিকার শিশুর প্রয়োজন বিচার ও সুরক্ষা; বিয়ে নয়। দারিদ্র্যের কারণে ঝুঁকিতে থাকা শিশুর প্রয়োজন আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা। নিরাপত্তাহীনতার শিকার শিশুর প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়। এসব সংকটে বিয়েকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালে থেকে যেতে পারে, আর শিশুকে বহন করতে হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি।
বাল্যবিবাহের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী
অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ সংকুচিত হয় এবং পরিবার ও সমাজে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের সঙ্গে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও জড়িত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী মায়েদের মধ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মায়েদের তুলনায় একল্যাম্পসিয়া, প্রসব-পরবর্তী জরায়ুর সংক্রমণ এবং অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। তাঁদের নবজাতকের অপরিণত জন্ম, কম ওজন এবং গুরুতর স্বাস্থ্যজটিলতার ঝুঁকিও বেশি।
অতএব, কোনো সংকটের তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে শিশুর বিয়ের অনুমোদন দেওয়া হলেও তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি উপেক্ষা করা যায় না। শিশুর বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, স্বাধীনতা ও মর্যাদাও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের একাধিক নির্দেশক গুচ্ছ জরিপের প্রাথমিক ফলেও উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ২০১৯ সালের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে বর্তমানে বিবাহিতের হার ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
দুটি সূচকের সময়কাল ও পরিমাপের ধরন আলাদা। তাই এসব সংখ্যা দিয়ে ১৯ ধারাকে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তবে পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, কিশোরীদের বিয়ের ঝুঁকি এখনো গুরুতর। এ অবস্থায় আইনের ব্যতিক্রমী বিধান যেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে দুর্বল না করে, তা নিশ্চিত করা দরকার।
বিয়ের বদলে সুরক্ষার ব্যবস্থা
১৯ ধারা বাতিলের পক্ষে যুক্তি হলো—শিশুর সংকটের সমাধান বিয়ের মাধ্যমে নয়, অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে হওয়া উচিত। নির্যাতন বা শোষণের শিকার শিশুকে নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা ও আইনি সেবা দিতে হবে। দারিদ্র্যের কারণে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনতে হবে। শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে তা পুনরায় চালু রাখার সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে জরুরি। প্রথমত, ন্যূনতম বিয়ের বয়সসংক্রান্ত বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য গোপনীয় অভিযোগ, নিরাপদ আশ্রয় ও দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহের কারণ ও প্রবণতা চিহ্নিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং নজরদারি জোরদার করতে হবে।
বিশেষ পরিস্থিতিতে শিশুর বিয়েকে অনুমোদনের সুযোগ রাখার পরিবর্তে সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ১৯ ধারার পুনর্বিবেচনা ও বাতিলের দাবি তাই শুধু একটি আইনি ধারার প্রশ্ন নয়; এটি শিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
শিশুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তার নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। কোনো সামাজিক চাপ, পারিবারিক সংকট কিংবা অস্পষ্ট ব্যতিক্রম যেন তার শৈশব কেড়ে নেওয়ার পথ তৈরি না করে। আইন ও বাস্তব ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া দরকার—শিশুকে বিয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং তাকে নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া।




