প্রবাসী আয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। কিন্তু প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসার বাড়তি ব্যয় এবং নতুন বিনিয়োগে অনীহা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। তবে অর্থনীতির অন্যান্য সূচকে এখনো চাপ রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মন্থরতা, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, শিল্প সম্প্রসারণে বাধা এবং রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমিত করছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সৌদি শ্রমবাজার ঘিরে নতুন উদ্বেগ
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং লাখো পরিবারের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে কর্মী পাঠানো এবং নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় সৌদিগামী প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানো বা নতুন করে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মী পাঠানোর গতি ব্যাহত হতে পারে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সের প্রবাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বিমান চলাচল, কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং সৌদি শ্রমবাজারের পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, উৎপাদনে চাপ
রেমিট্যান্স বাড়লেও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্পে বিনিয়োগ, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান জরুরি। কিন্তু উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হয়। এতে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার গতি কমে যেতে পারে। আবার বাজারে চাহিদা দুর্বল হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সম্প্রসারণে আরও সতর্ক হয়। ফলে বিনিয়োগ ও চাহিদার দুর্বলতা পরস্পরকে প্রভাবিত করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মন্থর করে দিতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ
খাদ্য, পরিবহন, বাসাভাড়া ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আয় একই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এতে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
একই সময়ে জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় বাড়লে উৎপাদনকারীদের মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হয়। তাই রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলো অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
প্রবৃদ্ধির সুফল ছড়িয়ে দেওয়াই পরীক্ষা
প্রবাসী আয়ের রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে স্বস্তি দিলেও একে টেকসই উন্নয়নে রূপ দিতে হলে উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি ফেরানো জরুরি। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের শ্রমবাজারে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেখা দিলে তা মোকাবিলায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সচল রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফেরানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। সব মিলিয়ে, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থ




