রাজধানীর নগরজীবনে দীর্ঘদিনের অন্যতম ভোগান্তির নাম ফুটপাত দখল। পথচারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় দোকানপাট ও অস্থায়ী স্থাপনার বিস্তারে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হয়েছে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল। সেই পরিস্থিতি পাল্টাতে এবার উচ্ছেদ কার্যক্রমের পাশাপাশি সবুজায়ন ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
নতুন উদ্যোগে রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশের ফুটপাত পরিষ্কার করা হয়েছে। কোথাও বসানো হয়েছে ফুলের টব, কোথাও লাগানো হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। আবার কিছু এলাকায় পথচারীদের বসার ব্যবস্থা ও দেয়ালে শিল্পকর্ম যুক্ত করে পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা চলছে।
উত্তর ঢাকার মিরপুর অঞ্চলে পরিবর্তনের চিত্র বেশ স্পষ্ট। শাহ আলী মার্কেট, মুক্তবাংলা মার্কেট, পাইকপাড়া, বাঙলা কলেজ, সনি সিনেমা হলের মোড় থেকে শুরু করে মিরপুর-১০ গোলচত্বর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের ফুটপাত দখলমুক্ত করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। একই কার্যক্রমের আওতায় এসেছে শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকা, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, পর্বতা, ফলপট্টি ও শাহ আলী প্লাজাসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
ফুটপাতগুলোতে দোকানের সারি কমে যাওয়ায় এখন পথচারীদের চলাচলের সুযোগ বেড়েছে। আগে যেসব জায়গায় হাঁটার জন্য সড়কে নামতে হতো, সেখানে মানুষ আবার ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন। উচ্ছেদ করা জায়গায় নতুন করে দখল ঠেকাতে গাছ লাগানো ও সৌন্দর্যবর্ধনের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা আর অবৈধভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না। তার ভাষ্য, হকার ও কিছু প্রভাবশালী চক্রের কারণে ফুটপাতের সীমা পেরিয়ে সড়কের অংশও দখল হয়ে গিয়েছিল। এতে নগরবাসী নিজেদের হাঁটার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর দক্ষিণ অংশেও একই ধরনের পরিবর্তন আনার কাজ চলছে। গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট, মৎস্য ভবন ও সেগুনবাগিচাসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা সরানোর পাশাপাশি সড়কের মাঝের বিভাজক, চত্বর ও উন্মুক্ত জায়গায় গাছ লাগানো হচ্ছে।
নীলক্ষেত এলাকায় নিউমার্কেটের এক নম্বর প্রবেশপথ থেকে চার নম্বর গেট পর্যন্ত এবং প্রিয়াঙ্গন সুপার মার্কেট থেকে নীলক্ষেত মোড়ের সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। এসব স্থানে পুনরায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠা ঠেকাতে ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছের টব রাখা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সবুজায়ন কার্যক্রমের পরিসরও বড়। সংস্থাটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সড়ক, পার্ক, খেলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চত্বর ও বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে সব মিলিয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ১২০টি গাছ লাগানো হয়েছে।
এর মধ্যে ৪০ কিলোমিটার সড়ক মিডিয়ানের ৩১ কিলোমিটার এলাকায় রোপণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার গাছ। বিভিন্ন চত্বরের ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার অংশে যুক্ত হয়েছে ৮ হাজার গাছ। পাশাপাশি ১ দশমিক ১৭ কিলোমিটার সড়কদ্বীপে লাগানো হয়েছে ২ হাজার ৩০০টি গাছ।
নগরীর সাতটি সংসদীয় এলাকায় ৫০০টি করে মোট ৩ হাজার ৫০০টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। উন্নয়ন করা ২৩টি খেলার মাঠের মধ্যে ১২টির চারপাশে রয়েছে ৯০০টি গাছ। অন্যদিকে ২৫টি পার্ক ও উদ্যানের ১৪টিতে লাগানো হয়েছে ৮০০টি ফলজ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫২০টি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আরও ৪০০টি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সড়কের সৌন্দর্য ধরে রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে ডিএসসিসির। এ লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বিভাজকগুলো পরিচর্যা ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল মোড়, শিক্ষা ভবন, কাকরাইল, মগবাজার, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গভবন ও দৈনিক বাংলা মোড়সহ রাজধানীর বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এ পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে। এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, শাহবাগ, মালিবাগ, পান্থপথ ও ধানমন্ডি এলাকার সড়কেও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সেগুনবাগিচায় ফুটপাত সংস্কারের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর একটি উদ্যোগও বাস্তবায়ন করেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সেখানে স্থাপন করা হয়েছে ডাস্টবিন, তৈরি করা হয়েছে বসার বেঞ্চ এবং মেরামত করা হয়েছে সীমানাপ্রাচীর। দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়সহ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের ১০ বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি। ফলে সাধারণ চলাচলের জায়গাটিতে যুক্ত হয়েছে শিল্প ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নাগরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতেই এসব কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ফুটপাত কিংবা সড়ক দখলের কোনো সুযোগ রাখা হবে না বলে জানান তিনি।
উচ্ছেদের পর আবারও দখল ফিরে আসার বিষয়ে তিনি বলেন, অবৈধভাবে কোনো স্থাপনা তৈরি হলে পুনরায় অভিযান চালানো হবে। সতর্কতা ও আলোচনার পরও কেউ নিয়ম অমান্য করলে মালামাল জব্দের পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে গ্রেফতারের পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের দৃষ্টিতে, ফুটপাতের সঠিক ব্যবহার ও পরিকল্পিত সবুজায়ন একটি শহরের বাসযোগ্যতা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পথচারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে সড়কে নামার প্রবণতা কমে এবং যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলও সহজ হয়। অন্যদিকে পর্যাপ্ত গাছপালা নগরের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির মনে করেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নগরবাসীর দীর্ঘদিনের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে শুধু উচ্ছেদ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। নিয়মিত নজরদারি, পরিচ্ছন্নতা এবং সবুজায়ন ধরে রাখার পাশাপাশি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের পুনর্বাসনে কার্যকর পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
রাজধানীর পরিবর্তনের এই উদ্যোগ কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক তদারকির ওপর। একই সঙ্গে নগরবাসীর সচেতন অংশগ্রহণও প্রয়োজন। পথচারীদের অধিকার রক্ষা, সড়কে শৃঙ্খলা এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ঢাকা কেবল দখলমুক্ত নয়, আরও বসবাসযোগ্য নগরী হয়ে উঠতে পারে।




