মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারে সরকারি ভর্তুকি চালুর আহ্বান জানিয়েছেন কৃষি বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা। একই সঙ্গে জৈব সার উৎপাদনকারীদের নিবন্ধন সহজ করা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণে বিদ্যমান বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সুস্থ মাটি, ফসল ও পরিবেশের জন্য জৈব সার উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং ভর্তুকি প্রদান’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব প্রস্তাব উঠে আসে। একশনএইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ ২০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৬-এ ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
আলোচনায় কৃষক ও উদ্যোক্তারা জানান, জৈব সার উৎপাদন ও বাজারজাত করতে গিয়ে নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি মান যাচাই ও নিয়মিত তদারকির দুর্বলতার কারণে বাজারে মানসম্মত সার সরবরাহ নিশ্চিত করাও কঠিন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈব সার ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ফলন রাসায়নিক সারের তুলনায় কম হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের গুণগত মান বজায় রাখতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে রাসায়নিক সার পুরোপুরি বাদ না দিয়ে মাটি ও ফসলের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দুই ধরনের সারের সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বৈঠকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত সংসদ সদস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোছা. সাবিরা সুলতানা বলেন, মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকলেই পুষ্টিমানসম্পন্ন ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। জৈব সারের মান নিশ্চিত করে বাজারজাতকরণের পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ডের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কার্ডের সুবিধা যেন প্রকৃত কৃষকরা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। গোলটেবিলের আলোচনা থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরার আশ্বাস দেন।
দ্বিতীয় কারিগরি অধিবেশনে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালক মো. আনোয়ার ফারুক জৈব সার উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করতে জেলা পর্যায়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, মাটির স্বাস্থ্য ও কাঙ্ক্ষিত পিএইচ মাত্রা বজায় রাখতে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের সুষম ব্যবহার প্রয়োজন। তবে কৃষকদের কাছে সময়মতো বিজ্ঞানসম্মত তথ্য পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি হচ্ছে সুস্থ মাটি। জৈব সারের মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণে অনিয়ম দূর করা এবং উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দিনব্যাপী আলোচনায় জৈব সার উৎপাদনের কাঁচামাল নিশ্চিত করা, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সারের প্রয়োগমাত্রা নির্ধারণ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর বিষয়গুলোও উঠে আসে।
বৈঠকে কৃষি গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, কৃষক ও জৈব সার উদ্যোক্তারা অংশ নেন। আলোচনার শেষ পর্যায়ে জৈব সার উৎপাদনকারীদের জন্য ভর্তুকির নীতিমালা প্রণয়ন, নিবন্ধন সহজ করা এবং মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।