নানা প্রতিকূলতার মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের স্বপ্না ছাগল পালন করে আজ স্বাবলম্বী। সমাজের অবহেলা, কট‚ক্তি ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে শুরু করেন ছাগল পালন। মাত্র দুটি ছাগল দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন তাঁর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। ছাগল পালন করেই সংসার চালানোর পাশাপাশি খামারটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন তৃতীয় লিঙ্গের স্বপ্না।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর মিলপাড়া এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করেন স্বপ্না (২৩)। তাঁর বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নুরজাহান বেগম। আর্থিক অনটন ও সামাজিক নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।
স্বপ্না জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় জীবিকার তাগিদে একসময় তাঁকে অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে হতো। এ সময় নানা ধরনের কট‚ক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজেই কিছু করবেন। সেই চিন্তা থেকেই ছাগল পালনের উদ্যোগ নেন তিনি।
প্রথমে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দুটি ছাগল নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন স্বপ্না। তাঁর মা নুরজাহান বেগম জানান, তাঁদের নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই। রেলওয়ের জায়গায় বসবাস করেন তাঁরা। সংসার চালাতেও নানা কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। পাশের বাড়ির একজনকে ছাগল পালন করতে দেখে স্বপ্নারও ছাগল কেনার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তাঁর বাবা ১৩ হাজার ও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে দেন। সেই দুটি ছাগল দিয়েই শুরু হয় স্বপ্নার খামার।
শুরুতে অল্প কয়েকটি ছাগল নিয়ে পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে ছাগলের সংখ্যা ১২টিতে উন্নীত হয়। কিন্তু হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়টি ছাগল মারা যায়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি ছাগল মারা যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। তবে সব প্রতিক‚লতা সামলে আবারও ঘুরে দাঁড়ান স্বপ্না। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। এসব ছাগলের মধ্যে তোতা, হরিয়ানা, বিটল, যমুনাপাড়ি ও বø্যাক বেঙ্গলসহ বিভিন্ন জাত রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিটি ছাগলের বাজারমূল্য ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
স্বপ্নার ভাষ্য, খামারের ছাগলের পাঠা প্রজননের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। এ ছাড়া বছর শেষে বিক্রির উপযোগী ছাগল বিক্রি করেও ভালো অর্থ পাওয়া যায়। গত বছর চট্টগ্রামে বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে ১০টি ছাগল বিক্রি করে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
স্বপ্না বলেন, “আমি চাই না, জীবিকার জন্য আর কারও কাছে হাত পাততে হোক। এই খামার দিয়েই আমার সংসার চলে। অনেক কষ্ট করে খামারটি দাঁড় করিয়েছি। মাঝেমধ্যে ছাগল মারা যাওয়ায় লোকসানও হয়েছে। তারপরও হাল ছাড়িনি। আমার স্বপ্ন, খামারটিকে আরও বড় করা। সরকার যদি আমাকে সহযোগিতা করে, তাহলে আরও উন্নতভাবে ছাগল পালন করতে পারব। স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও উদাহরণ তৈরি করতে চাই।”
সমাজের নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও স্বপ্নার এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও জীবিকার পথ তৈরি করা সম্ভব। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারি সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে খামারটি আরও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। এতে নিজের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নও পূরণ হবে।



