কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে বারোমাসিয়া (বাণিদাহ) নদীর ওপর নির্মিত বাঁশের সাঁকো ভেঙে যাওয়ায় দুই পাড়ের অন্তত আট গ্রামের মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ সাঁকোটির অর্ধেকের বেশি অংশ দুই থেকে তিন মাস ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকলেও সংস্কারের উদ্যোগ নেই। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ বুকসমান পানিতে হেঁটে, কেউ সাঁতরে আবার কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা অংশ দিয়ে নদী পার হচ্ছেন।
বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে। নদী পারাপারের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। দ্রুত সাঁকোটি মেরামত কিংবা নতুন করে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী এলাকায় নবিউলের ঘাট নামে পরিচিত স্থানে গিয়ে দেখা যায়, সাঁকোটির দক্ষিণ পাশের মাঝামাঝি প্রায় ১৫০ ফুট অংশ ভেঙে গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে পারাপারের কোনো উপায় নেই। কেউ পানিতে নেমে, কেউ সাঁতরে নদী পার হচ্ছেন। আবার কেউ ভাঙা কাঠামো আঁকড়ে ধরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় এ নদী পারাপারে ডিঙি ও মাঝারি আকারের নৌকা ছিল একমাত্র ভরসা। করিমের ঘাট ও নবিউলের ঘাট দিয়ে ইজারাদারের মাধ্যমে দুই পাড়ের মানুষ যাতায়াত করতেন। পরে নদীর প্রশস্ততা কমে এলে স্থানীয়দের উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়। প্রায় দেড় দশক ধরে এই সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করছেন।
প্রতি বছর বর্ষার আগে স্থানীয়ভাবে সাঁকোটি মেরামত করা হলেও এবার দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এর পাটাতন ও অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুই থেকে তিন মাস আগে বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। এরপর থেকে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
ক্ষতিগ্রস্ত সাঁকোটির কারণে নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী, চরগোরকমন্ডল, ঝাউকুটি, পশ্চিম ফুলমতি, নাওডাঙ্গা ও শিমুলবাড়ী হকবাজার এলাকার মানুষ বিপাকে পড়েছেন। একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরখারুয়া ও খারুয়া গ্রামের বাসিন্দারাও।
মাথায় বাদামের বোঝা নিয়ে বুকসমান পানি পার হচ্ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মিনতি রানী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুই-তিন মাস ধরে এভাবে কষ্ট করে নদী পার হতে হচ্ছে। সন্তানদেরও ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। অথচ দুর্ভোগ কমাতে কেউ কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছেন না। দ্রুত সাঁকোটি মেরামতের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী আকাশ মাহমুদ ও কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, এলাকার মানুষ নিয়মিত বালারহাট বাজারে যাতায়াত করেন। এ ছাড়া দেড় থেকে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বালারহাট আদর্শ স্কুল, বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ফুলবাড়ী কলেজে পড়াশোনা করে। সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় তাদের প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী সুমন মিয়া, শাকিব, সবুজ মিয়া, সাইফুল ইসলাম, আব্দুল জব্বার ও মঈনুদ্দিন জানায়, বিকল্প কোনো পথ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। কখনো সাঁতরে, কখনো ভাঙা সাঁকো ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। পারাপারের সময় অনেকে পড়ে গিয়ে আহতও হয়েছেন। দ্রুত সাঁকোটি সংস্কারের দাবি জানায় তারা।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় মৎস্য খামারি আতাউর রহমান রতন বলেন, দুই পাড়ের মানুষের চলাচলের প্রধান অবলম্বন এই সাঁকো। এটি ভেঙে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত মেরামত অথবা টেকসই নতুন সাঁকো নির্মাণ করা জরুরি।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী জানান, সাঁকোটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। এটি নির্মিত হলে দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ হাসান বলেন, সাঁকো ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে একটি টেকসই বাঁশের সাঁকো নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।