বরগুনা পৌরবাসীর নাগরিক সুবিধা বাড়াতে নেওয়া প্রায় ৪০ কোটি ১৫ লাখ টাকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নির্মাণ ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে থমকে আছে। কোথাও কাজ শেষ না হওয়ায় ভবন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়, কোথাও অবকাঠামো তৈরি হলেও চালু হয়নি সেবা। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না পৌরবাসী।
পৌরবাসীর অভিযোগ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা, অর্থের সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে নাগরিক সেবার সংকটও কাটছে না। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ অস্বীকার বা নিশ্চিত করার মতো কোনো স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পভেদে অর্থ, আনুষঙ্গিক কাজ ও জনবল সংকটই বড় বাধা।
সভা-সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বরগুনা শহরের সিরাজউদ্দীন সড়কে ৫০০ আসনবিশিষ্ট টাউন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৮ সালের মার্চে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৭ কোটি ২ লাখ টাকা এবং চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মার্চে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, ২০২২ সালের দিকে ভবনের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও পরবর্তী সময়ে অর্থসংকট ও বরাদ্দ ব্যবস্থাপনার জটিলতায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে নির্মাণাধীন ভবনটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবনের দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও খুলে নেওয়া হচ্ছে। খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য চিত্তরঞ্জন শীল বলেন, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিকাশের জন্য টাউন হলটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য কক্ষ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এত টাকা ব্যয়ের পরও এর কোনো সুফল মিলছে না।
জেলা শ্রমিক আন্দোলনের সাবেক সভাপতি গোলাম হায়দার স্বপনের অভিযোগ, ভবনটি সম্পূর্ণ হলে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো উপকৃত হতো। তাঁর দাবি, মেয়র পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রকল্পটির কাজ আর এগোয়নি। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরিফ অ্যান্ড আসিফ কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মো. আবুল হোসেন খান বলেন, কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ করার পর প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হওয়ায় তাঁরা বাকি কাজ শেষ করতে পারেননি। তাঁর দাবি, প্রকল্পের তহবিলে প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া হলে তিনি অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে প্রস্তুত।
বরগুনা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাছুম বিল্লাহ বলেন, কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও তারা কাজ শেষ করেনি। তাঁর দাবি, ঠিকাদার ইতোমধ্যে প্রায় চার কোটি টাকা বিল নিয়েছেন। প্রকল্পের অর্থ অন্য খাতে ব্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, কাজ শুরু হলে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা হবে।
 ট্যাংক তৈরি, পানি নেই
পৌরবাসীর পানি সংকট নিরসনে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি উচ্চ জলাধার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। একটি জেলা পরিষদের সামনে এবং অন্যটি কলেজ রোড এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে। দরপত্র অনুযায়ী ২০২০ সালের নভেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
অবকাঠামোর বেশির ভাগ কাজ শেষ হলেও কিছু আনুষঙ্গিক কাজ বাকি থাকায় এখনো চালু হয়নি জলাধার দুটি। ফলে একদিকে পৌরবাসী পানির সংকটে রয়েছেন, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা।
বরগুনা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, কয়েক বছর আগে পানির ট্যাংক নির্মাণ হলেও সেখান থেকে নাগরিকরা পানি পাচ্ছেন না। তাঁর মতে, জনগণের অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্প দ্রুত চালু না হলে এসব অবকাঠামোই একসময় অকার্যকর হয়ে পড়বে।
পৌর প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, পানির ট্যাংক দুটি নির্মাণ করা হলেও প্রকল্পে কিছু আনুষঙ্গিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ছিল না। অর্থসংকটের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি।
১৬ কোটি টাকার বর্জ্য শোধনাগারও অচল
পৌরবাসীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বরগুনা সদর ইউনিয়নের হেউলিবুনিয়ায় নির্মাণ করা হয় একটি আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার।
‘বরগুনা পৌর সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ আওতায় নির্মিত স্থাপনাটি ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পরও এটি কার্যকরভাবে চালু হয়নি। ফলে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বিভিন্ন স্থানে খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, কোটি টাকা ব্যয়ে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের পরও যদি তা ব্যবহার না করা হয়, তাহলে পৌরবাসীর অর্থের সুফল কোথায়—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।
পৌর প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, বর্জ্য শোধনাগার চালু না হওয়ার অন্যতম কারণ জনবল সংকট। প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পৌরবাসী যে ভোগান্তিতে রয়েছেন, তা স্বীকার করে তিনি বলেন, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এসব প্রকল্প নেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও পুরোপুরি চালু না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় অর্থ, জনবল, পরিচালনব্যবস্থা ও আনুষঙ্গিক কাজের নিশ্চয়তা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল?
পৌরবাসীর প্রত্যাশা, নির্মাণাধীন ও অচল প্রকল্পগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রকল্পে কাজ অসম্পূর্ণ, সেগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামোগুলো কার্যকর নাগরিক সেবায় যুক্ত করা হবে।