ইতালিতে পাঠানো এবং মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির আশ্বাস দিয়ে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার আরিফুল ইসলামকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে জিম্মি করে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ভাইকে মুক্ত করতে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ১০ লাখ টাকা দেন তার বড় ভাই উজ্জ্বল হোসেন। পরিবারের অভিযোগ, পরে তাদের বাবা ইজাল উদ্দিনকেও অপহরণ করা হয় এবং তাকে মুক্ত করতে আরও ১০ লাখ টাকা দিতে হয়। আরিফুলের পরিবারের এই অভিজ্ঞতা ইউরোপে যাওয়ার আশায় বিপজ্জনক অভিবাসনপথ বেছে নেওয়া বাংলাদেশিদের দুর্ভোগের একটি উদাহরণ।
 অভিযোগ অনুযায়ী, ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিবাসীদের লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলে। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসানের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে যাওয়ার জন্য কোনো কোনো বাংলাদেশি ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করছেন। কিছু ক্ষেত্রে এ ব্যয়ের পরিমাণ ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। এত অর্থ খরচ করেও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্রন্টেক্সের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছেছেন। ২০২৫ সালে এই পথে পৌঁছান ২০ হাজার ২৫৯ জন।
 ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে লিবিয়া থেকে ইতালিতে ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি পৌঁছেছেন বলে তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সংখ্যা ইউরোপে পৌঁছানো ব্যক্তিদের হিসাব; নিখোঁজ, নিহত বা দেশে ফিরে আসা মানুষের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়। **ভূমধ্যসাগরে প্রাণহানির ঘটনা** ২০২৬ সালের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে একটি নৌযানে ছয় দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে আগস্টে ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিককে নিয়ে যাত্রা করা আরেকটি নৌযান প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। 
ওই ঘটনায় অন্তত নয় বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। **দেশে ফিরছেন অনেকে** লিবিয়ায় আটকে পড়া ও বিপদে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগও চলছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট, ১ সেপ্টেম্বর ও ১৫ সেপ্টেম্বর—এই তিন দফায় মোট ৫১৬ জন দেশে ফিরেছেন। গত ছয় বছরে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরা মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার বলে উল্লেখ করেছে ব্র্যাক। দেশে ফিরে আসার পরও অনেক অভিবাসীকে ঋণ পরিশোধ, বিক্রি করা সম্পদ হারানোর ক্ষতি এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।
 ব্র্যাকের একটি গবেষণায় অংশ নেওয়া লিবিয়া থেকে ফেরত আসা অভিবাসীদের ৭৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন শিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং ৬৯ শতাংশ চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছিলেন। এই পরিসংখ্যান গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নিয়োগদাতা ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার বৈধতা যাচাই করা জরুরি। অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা প্রাণহানি ও মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।