আইনে নারীর উত্তরাধিকার অধিকার স্বীকৃত। তবু বাস্তবে বাবার সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক নারী। পারিবারিক চাপ, সামাজিক কুসংস্কার, আইনি অজ্ঞতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সহিংসতার আশঙ্কায় অনেকে নিজেদের প্রাপ্য দাবি করতেও সাহস পান না। ফলে আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও সম্পত্তির প্রশ্নে নারীর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
আইনে কী অধিকার রয়েছে
বাংলাদেশে ধর্মভেদে উত্তরাধিকার আইনের বিধান ভিন্ন। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কন্যা ও বোন বৈধ উত্তরাধিকারী। বিয়ের পরও বাবার সম্পত্তিতে তাঁদের অধিকার বহাল থাকে। তবে প্রাপ্য অংশ নির্ভর করে মৃত ব্যক্তির জীবিত উত্তরাধিকারী এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর।
যেমন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে মারা গেলে ঋণ ও প্রযোজ্য ব্যয় পরিশোধের পর স্ত্রী পান এক-অষ্টমাংশ। অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টিত হয়। অর্থাৎ প্রতিটি ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায়। এই হিস্যা আইনে নির্ধারিত; এটি ভাইয়ের দয়া বা অনুগ্রহ নয়।
পারিবারিক চাপ ও সামাজিক ধারণা
‘তুমি তো স্বামীর বাড়িতে আছ’, ‘ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট কোরো না’ কিংবা ‘মেয়েরা সম্পত্তি চাইলে সংসারে অশান্তি হয়’—এ ধরনের কথা অনেক নারীকে তাদের প্রাপ্য দাবি করা থেকে বিরত রাখে। ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় কিংবা পরিবারের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা নীরব থাকেন।
সমাজে প্রচলিত ‘মেয়ে পরের ঘরের মানুষ’ ধারণাটিও এ বঞ্চনার অন্যতম কারণ। বিয়ের পর মেয়ের অন্য সংসারে চলে যাওয়াকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে বাবার সম্পত্তিতে তাঁর অধিকারকে খাটো করা হয়। অথচ বিয়ে কোনো নারীর উত্তরাধিকার অধিকার বাতিল করে না।
কাগজপত্রে হারিয়ে যায় অধিকার
অনেক নারী উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। বাবার মৃত্যুর পর ভাইয়েরা একতরফাভাবে জমির নামজারি করে ফেলেন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরও করেন। পরে নিজের অংশ দাবি করতে গিয়ে নারীদের নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
মৌখিকভাবে সম্পত্তি না নেওয়ার কথা বললেই আইনগত অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না। তবে বৈধ দলিলের মাধ্যমে অধিকার ত্যাগ বা হস্তান্তর করা হলে তার আইনি প্রভাব তৈরি হতে পারে। তাই না বুঝে কোনো বণ্টননামা, হস্তান্তর দলিল বা অন্য কাগজে স্বাক্ষর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিচার পেতে বাধা
উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে ওয়ারিশান সনদ, ভূমির রেকর্ড, নামজারি, বণ্টননামা এবং প্রয়োজনে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়। দীর্ঘসূত্রতা, মামলার খরচ ও আইনি সহায়তার অভাবে অনেক নারী শেষ পর্যন্ত দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ান।
কিছু ক্ষেত্রে সম্পত্তির দাবি তোলার কারণে তাঁদের অপমান, নির্যাতন, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ কিংবা প্রাণনাশের হুমকির মুখেও পড়তে হয়। ফলে সম্পত্তির অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি শুধু আইনি নয়, নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় প্রভাব
বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়া নারীর আর্থিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করে। স্বামীর মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ বা আর্থিক সংকটের সময় নিজের সম্পদ না থাকায় অনেক নারী অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর প্রভাব পড়ে সন্তানদের শিক্ষা, ভরণপোষণ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায়ও।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে নারীদের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে সচেতন করা, সম্পত্তির কাগজপত্র সংরক্ষণ, ভূমি রেকর্ডে তাঁদের অংশ নিশ্চিত করা এবং বিনা খরচে বা স্বল্প খরচে আইনি সহায়তার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। কোনো দলিলে স্বাক্ষরের আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর উত্তরাধিকার অধিকার কোনো পারিবারিক অনুগ্রহ নয়; এটি আইন অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য। সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য হিস্যা প্রতিষ্ঠার পথ সহজ হবে।