বাংলাদেশের অনেক এলাকায় নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা না থাকায় প্রতিদিনের জীবনযাপনে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের দায়িত্ব যাদের ওপর বেশি পড়ে, সেই নারী ও শিশুরা সময় ও শ্রমের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
দেশের ১৭ শতাংশ মানুষ পানি সংগ্রহ ও বহনে প্রতিদিন ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় দেন। আরও ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে এ কাজে ব্যয় হয় এক থেকে তিন ঘণ্টা। পানি বহনের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী ও শিশু। ফলে পানির সংকটের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে তাদের ওপর অতিরিক্ত শ্রমের চাপও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতির পেছনে অঞ্চলভেদে রয়েছে নানা কারণ। কোথাও পানির উৎস বাড়ি থেকে অনেক দূরে, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় পানি পেতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, শুষ্ক মৌসুমে জলাধার শুকিয়ে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও অনেক স্থানে পানির প্রাপ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
পানি বহনের জন্য দীর্ঘ পথ হাঁটা এবং ভারী পাত্র টানার ফলে নারীদের ঘাড়, পিঠ, কোমর ও কাঁধে ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। নিয়মিত এমন পরিশ্রমে শরীরে ক্লান্তি জমে। শিশুদের জন্যও এই দায়িত্ব ঝুঁকিপূর্ণ। বয়স অনুযায়ী অতিরিক্ত ভার বহন তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পানির পেছনে সময় দিতে গিয়ে শিশুদের পড়াশোনাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পানি সংগ্রহের কারণে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দেরি, পড়ার সময় কমে যাওয়া এবং শারীরিক ক্লান্তির কারণে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিশেষত স্বল্প আয়ের পরিবারের শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি বাড়তি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল। পানি সংগ্রহের কাজের পাশাপাশি রান্না, সন্তানদের দেখাশোনা ও ঘরের অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। এতে অবসর, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত যত্ন কিংবা আয়মূলক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আসে। দীর্ঘদিনের এই চাপ মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগের কারণও হতে পারে।
পানির সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি। দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে ডায়রিয়া ও কলেরার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। শুধু উৎসের পানি নিরাপদ হলেই চলবে না; সংগ্রহের পর তা কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা এবং সংরক্ষণের পাত্র পরিষ্কার রাখার বিষয়েও সতর্কতা প্রয়োজন।
সমস্যা মোকাবিলায় দেশের প্রতিটি এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় পরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, উপযোগী শোধনপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বাড়ির কাছাকাছি পানির উৎস স্থাপন, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর নিয়মিত দেখভাল নিশ্চিত করতে হবে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নারী ও শিশুদের অভিজ্ঞতাও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও হাত ধোয়ার সুবিধা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলোর জন্য সহজলভ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা মানুষের সুস্থতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পানি সংগ্রহের পেছনে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হলে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ কমে এবং নারীদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এতে নারী ও শিশুদের অতিরিক্ত পরিশ্রম কমবে, স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার ও সামাজিক সমতারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।




