শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিথি মহাষ্টমী। দেবী দুর্গার আরাধনা, অঞ্জলি, কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ধর্মীয় বিশ্বাসে মহাষ্টমী অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক।
ঢাকের বাদ্য, ধূপের সুগন্ধ, ফুলের অঞ্জলি আর মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন শক্তি, সাহস, শান্তি, জ্ঞান ও সমৃদ্ধির। মহাষ্টমী শুধু ধর্মীয় আচার পালনের দিন নয়, আত্মশুদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করারও উপলক্ষ।
মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দেবী
বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজায় মহাষ্টমীর প্রধান আরাধ্য মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা। প্রচলিত পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর দশ হাতে থাকা অস্ত্র তার বহুমুখী শক্তি ও দেবতাদের সম্মিলিত ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রতীক। সিংহ তার সাহস ও অদম্য শক্তির পরিচায়ক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় অন্যায়, অহংকার ও অশুভের পরাজয়কে নির্দেশ করে।
দেবীর এই রূপের শিক্ষা হলো, প্রকৃত শক্তি শুধু প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার ক্ষমতা নয়; দুর্বলকে রক্ষা করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকাও শক্তির প্রকাশ।
অঞ্জলি ও কুমারী পূজা
মহাষ্টমীতে ভক্তরা ফুল, বেলপাতা ও মন্ত্রের মাধ্যমে দেবীর চরণে অঞ্জলি নিবেদন করেন। এই আচার ভক্তি, আত্মসমর্পণ ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
কুমারী পূজায় একটি বালিকাকে দেবীর প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধা ও পূজা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নারীশক্তির প্রতি সম্মান, নারীর মর্যাদা রক্ষা এবং নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বার্তা উঠে আসে।
সন্ধিক্ষণের বিশেষ পূজা
অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, এই সময়ে দেবী চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামের অসুরদের বধ করেন। প্রচলিত রীতিতে ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বালন ও পদ্ম নিবেদনের মাধ্যমে শুভশক্তির জয় কামনা করা হয়। নবদুর্গার ধারায় অষ্টম রূপ দেবী মহাগৌরী। তার শুভ্র ও শান্ত রূপ পবিত্রতা, ক্ষমা, প্রশান্তি ও আত্মিক পরিশুদ্ধির প্রতীক। মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার বীরত্ব এবং মহাগৌরীর শান্ত রূপ দেবীশক্তির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত।
মহাষ্টমীর শিক্ষা
মহাষ্টমীর তাৎপর্য পূজামণ্ডপের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর শিক্ষা ব্যক্তিজীবন ও সমাজেও প্রাসঙ্গিক। অহংকার, লোভ, হিংসা, ক্রোধ ও বিদ্বেষের মতো অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তিকে জয় করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী হওয়া এই দিনের অন্যতম বার্তা।
নারীর প্রতি সম্মান, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার অঙ্গীকার মহাষ্টমীর চেতনাকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
দেবী দুর্গার কাছে ভক্তদের প্রার্থনা—পৃথিবী থেকে দূর হোক অন্যায়, অমানবিকতা ও অশুভ শক্তি। মানুষের হৃদয় ভালোবাসা, বিবেক ও সহমর্মিতায় পূর্ণ হোক। সত্যের পথে চলার সাহস এবং অন্যের প্রতি ক্ষমা ও মমতা প্রদর্শনের প্রজ্ঞা লাভ করুক সবাই। মহাষ্টমী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত বিজয় শুধু বাইরের অশুভকে পরাজিত করা নয়, নিজের অন্তরের অন্ধকারকেও জয় করা। শুভ মহাষ্টমী। জয় মা দুর্গা।




