বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, বদলেছে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ও। তবে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলার অভিযোগ থামেনি। সম্প্রতি রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ ঘিরে আবারও সামনে এসেছে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছিল। সে সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ, আর বিএনপি ছিল বিরোধী দলে। সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও প্রাণহানির ঘটনার মধ্য দিয়ে সেদিনের সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। বিএনপি অভিযোগ করেছিল, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালানো হয়েছে।
তিন বছর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টেছে। বিএনপি এখন সরকারে। কিন্তু গত ২৬ অক্টোবর সোমবার রাতে পুরানা পল্টনে সিপিবির কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ ওঠার পর রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ছাত্র ও যুব ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সিপিবির কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছেন। এতে যুব ইউনিয়নের দুজন কর্মী আহত হন বলে তাদের দাবি। তবে পল্টন থানার পুলিশ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা অস্বীকার করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর ছাত্র ও যুব ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা সিপিবি কার্যালয়ের সামনে আনন্দ মিছিল করেন। মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে সিপিবির নেতাদের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মী ও হকারদের উত্তেজনা তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল আলম। তবে তিনি হামলা বা ভাঙচুরের অভিযোগ নাকচ করেছেন।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স ঘটনাটিকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, কোনো স্লোগান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিবাদ করা যেতে পারে, কিন্তু কোনো স্লোগান নিষিদ্ধ করা বা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। যাচাই ছাড়া বিএনপিকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসা একটি দলের ক্ষমতায় যাওয়ার পর আরও দায়িত্বশীল আচরণ করার কথা। কিন্তু ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের আগে ও পরে ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেও রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলা হলেও ক্ষমতায় গেলে সেই নীতির চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলার দীর্ঘ ইতিহাস
বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে।
১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক অচলাবস্থার সময়ে বিভিন্ন দলের কার্যালয় ও সংবাদপত্রের অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ১৯৯৬ সালে সংস্থাটি ‘পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স অন অল সাইডস’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টন-বায়তুল মোকাররম এলাকায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এর আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
২০১২ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী কর্মসূচির সময় জয়পুরহাট, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ও শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে বিএনপি ও জামায়াতের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও দখলের অভিযোগ ওঠে।
২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের সময় রাজধানীর পুরানা পল্টনে মুক্তি ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভবনটিতে সিপিবির কার্যালয়ও ছিল। অগ্নিকাণ্ডে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি নষ্ট হওয়ার কথা জানায় দলটি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই বছরের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এরপর ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। দলটির দাবি, শতাধিক ব্যক্তি কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন, অফিস সহকারীকে মারধর করেন এবং কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেন। সে সময় পুলিশ হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা অস্বীকার করেছিল।
একই বছরের ১৫ মার্চ সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘেরাওয়ের আহ্বান ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়। সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে কার্যালয়ের সামনে নিরাপত্তা জোরদার ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির সামনে প্রশ্ন
রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে যে অধিকার একটি দল নিজের জন্য দাবি করে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অন্য দলের জন্যও সেই অধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য, স্লোগান কিংবা কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে। রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা বা ভিন্নমত প্রকাশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট দলের ওপর আঘাত নয়, গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
সিপিবির কার্যালয়ে সাম্প্রতিক ঘটনার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের শনাক্ত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কতটা হয়েছে—সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় তাদের বাস্তব ভূমিকার ওপর।