দেশে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বারবার ফিরে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তার ভাষ্য, ফ্যাসিবাদ কোনো একক রাজনৈতিক দলের পরিচয় নয়; এটি এমন এক প্রবণতা, যার প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জনগণের প্রত্যাশা বুঝতে না পারলে অতীতের শাসকদের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জাতীয় বিপ্লবী ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দিবসটির তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হলেও রাজনীতিতে এর প্রতিফলন যথেষ্ট দেখা যায়নি।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শফিকুর রহমান তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে একদলীয় শাসন, বিরোধী মত দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অপব্যবহারের অভিযোগ আনেন। তার দাবি, রক্ষীবাহিনীকে জবাবদিহির বাইরে রেখে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বিনা বিচারে বহু মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারাও ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির অভাবকেও তিনি ওই সময়ের বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাকশাল প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক দুর্নীতি, ত্রাণসামগ্রী আত্মসাৎ এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়গুলোও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, এসব পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যা ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে ভূমিকা রাখে।
৭ নভেম্বরের স্মৃতিচারণ করে জামায়াত আমির জানান, ওই সময় তিনি সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। কারফিউ শিথিলের সময় জুমার নামাজে যাওয়ার পথে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখেছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সিপাহিরা বিদ্রোহের সূচনা করলেও পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের সমর্থন ঘটনাটিকে ব্যাপক তাৎপর্য দেয়। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দি ছিলেন এবং সিপাহিরাই তাকে মুক্ত করেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাধীনতার ইতিহাস ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, মুক্তিযুদ্ধে যার যে ভূমিকা ছিল, তাকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা দলের অবদান স্বীকার করতে গিয়ে অন্যদের ভূমিকা আড়াল করা উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে জেনারেল এমএজি ওসমানীর অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বক্তব্যে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান, এরশাদ সরকারের শাসন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলিও উঠে আসে। শফিকুর রহমানের মতে, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনরা মানুষের মতপ্রকাশ ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত করেছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্বের দায়িত্ব হচ্ছে সেই অধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বিএনপি সরকারের সময় জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে দলটি ১৮টি আসন নিয়ে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল। তবে সরকারে যোগ না দিয়ে বিরোধী দলেই থাকার সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত। তাদের মূল দাবি ছিল, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। এ দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ১৯৯৪ সাল থেকে আন্দোলন শুরু হয়েছিল বলে জানান তিনি।
রাজনীতিতে সমঝোতা ও নমনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির মানসিকতা না থাকলে রাজনৈতিক সংকট গভীর হয়। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। এতে দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।