বাল্যবিবাহে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া গেলেও বিয়ের শিকার কিশোরীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় না। বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও আইনি জটিলতা, আর্থিক অসচ্ছলতা, পারিবারিক চাপ ও সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয় অনেককে। তাই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে সম্পন্ন বিয়ে বাতিলের সহজ, দ্রুত ও ব্যয়মুক্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারব্যবস্থায় অপরাধীর জবাবদিহির পাশাপাশি সারভাইভারের অধিকার ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাল্যবিবাহের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এমআইসিএস জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর বয়সের আগে। আর ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।
অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক কিশোরীর শিক্ষাজীবন থেমে যায়। তারা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে এবং পারিবারিক সহিংসতার আশঙ্কার মুখে থাকে। নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও সীমিত হয়ে আসে। এসব কারণে বাল্যবিবাহকে শুধু আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও মানবিক ক্ষতি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
শাস্তির বিধান থাকলেও রয়েছে ফাঁক
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং পুরুষের ২১ বছর। প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। বিয়ে আয়োজন বা সম্পন্ন করায় জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বিয়ের আগে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে এবং সেই আদেশ অমান্য করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।
কিন্তু বাল্যবিবাহ সংঘটিত হওয়ার পর বিয়েটি বাতিল করার প্রশ্নে আইনে সুস্পষ্ট বিধানের অভাব রয়েছে। ফলে অপরাধের বিচার হলেও বিয়ের আইনগত অবস্থান নিয়ে জটিলতা থেকে যেতে পারে। অর্থাৎ, শাস্তির বিধান থাকলেই বিয়ের শিকার কিশোরীর মুক্তির পথ নিশ্চিত হয় না।
মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর ২(৭) ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে বাল্যবিবাহ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। বাবা বা অভিভাবকের মাধ্যমে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হলে নারী ১৯ বছর বয়সের আগে এ অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্ত ও সময়সীমা অনেকের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইনি সহায়তা, অর্থ, নিরাপত্তা কিংবা পরিবারের সমর্থন না থাকলে অধিকার থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বিচারের কেন্দ্রে থাকুক সারভাইভার
জোরপূর্বক বিয়ের শিকার একজন কিশোরী বিয়ে থেকে বেরিয়ে এলেও তার সমস্যা শেষ হয় না। কোথায় থাকবেন, কীভাবে পড়াশোনা চালাবেন, জীবিকা নির্বাহ করবেন কীভাবে—এসব প্রশ্নের পাশাপাশি সন্তানের ভরণপোষণ ও সামাজিক অপমানের আশঙ্কাও তাকে মোকাবিলা করতে হতে পারে।
এ কারণে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে সম্পন্ন বিয়ে বাতিলযোগ্য বা শূন্য ঘোষণার বিষয়ে স্পষ্ট আইনি বিধান প্রয়োজন। পরিবার আদালতে দ্রুত, কম খরচে এবং সারভাইভারের সম্মতি ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষ পরিস্থিতিতে বাল্যবিবাহের অনুমতি দেওয়ার বিধান পর্যালোচনা করে অপব্যবহারের সুযোগ সীমিত করা জরুরি।
বিয়ে বাতিলের পর ভরণপোষণ, সন্তানের কল্যাণ, নিরাপদ আবাসন ও সুরক্ষার বিষয়গুলোও আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি স্কুল, উপজেলা প্রশাসন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, পুলিশ ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা দরকার।
আইনের সঙ্গে চাই সহায়তার হাত
বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরীদের জন্য প্রতিটি উপজেলায় নিরাপদ আশ্রয়, মানসিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ, শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অভিভাবক, কাজি, শিক্ষক ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা সামাজিক প্রথার নামে বাল্যবিবাহকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা না হয়।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার, ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএর যৌথ কর্মসূচি চলমান থাকলেও আইন ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়নে আরও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন।
বাল্যবিবাহে বাধ্যকারীর শাস্তি অপরাধের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু পূর্ণ বিচার তখনই সম্ভব, যখন বিয়ের শিকার কিশোরী সহজে আইনি প্রতিকার পাবেন, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের সহায়তা পাবেন এবং শিক্ষা ও জীবিকায় ফিরে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারবেন। তাই শাস্তির পাশাপাশি বিয়ে বাতিলের কার্যকর ব্যবস্থা এবং সারভাইভার-কেন্দ্রিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।