বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, মানুষটি বেশ ভালো আছেন। মুখে হাসি, কথায় প্রাণচাঞ্চল্য, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দময় ছবি—সবই স্বাভাবিক। কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব পালন করছেন, পরিবারের খেয়ালও রাখছেন। অথচ এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর মানসিক কষ্ট।
একাকিত্ব, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা নিয়েও কেউ কেউ অন্যদের সামনে হাসিমুখে থাকেন। নিজের কষ্ট প্রকাশ করলে অন্যরা দুর্বল ভাববেন, কিংবা পরিবারের সদস্যদের চিন্তা বাড়বে—এমন আশঙ্কায় অনেকে মনের কথা চেপে রাখেন। মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে বলা হয় ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা হাসিমুখের আড়ালে বিষণ্নতা। এটি বিষণ্নতার স্বতন্ত্র আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়; বরং বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে বিষণ্নতার উপসর্গ থাকার একটি বর্ণনামূলক নাম।
কেন কষ্ট লুকিয়ে রাখেন অনেকে?
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ, দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ভয় এবং অন্যদের বোঝা না হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে নিজের অনুভূতি গোপন করতে প্ররোচিত করতে পারে। পরিবারের উপার্জনকারী, সন্তানের অভিভাবক, শিক্ষার্থী কিংবা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীল কেউ কেউ মনে করেন, তাঁদের ভেঙে পড়ার সুযোগ নেই। ফলে নিজের কষ্টের চেয়ে অন্যদের প্রত্যাশাকে বেশি গুরুত্ব দেন।
অনেকে আবার বুঝতেই পারেন না যে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, হতাশা কিংবা আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে। তাঁরা একে সাময়িক মন খারাপ বা জীবনের স্বাভাবিক চাপ ভেবে এড়িয়ে যান।
কীভাবে বুঝবেন সমস্যাটি গুরুতর হতে পারে?
হাসিমুখ দেখে কারও মানসিক অবস্থা নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে কিছু পরিবর্তন দেখা গেলে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেমন—আগে আনন্দ দিত এমন কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা, অতিরিক্ত অপরাধবোধ, ঘুম ও ক্ষুধার পরিবর্তন, সারাক্ষণ ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহীনতা।
কেউ বাইরে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও ব্যক্তিগত জীবনে গভীর শূন্যতা অনুভব করতে পারেন। আবার অতিরিক্ত কাজ বা ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে নিজের অনুভূতির মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে যেতে পারেন। তবে এসব লক্ষণের এক-দুটি থাকলেই বিষণ্নতা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিষণ্নতায় মন খারাপ, আনন্দ হারানো, শক্তির ঘাটতি, ঘুম ও ক্ষুধার পরিবর্তন এবং মনোযোগের সমস্যার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণত দিনের অধিকাংশ সময়, প্রায় প্রতিদিন, অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে এমন উপসর্গ থাকলে পেশাগত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিজের ক্ষতি করার চিন্তা দেখা দিলে দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করা উচিত নয়।
সাময়িক মন খারাপ আর বিষণ্নতা এক নয়
প্রিয়জনকে হারানো, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা ব্যর্থতার পর মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। সময় ও সামাজিক সমর্থনে অনেক ক্ষেত্রে তা কমে আসে। কিন্তু বিষণ্নতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি, কাজকর্ম ও সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। আগের পছন্দের বিষয়গুলোতে আনন্দ না পাওয়া, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা এবং দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
বিষণ্নতার ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি, শোক, বিচ্ছেদ, বেকারত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, নির্যাতন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা। তবে এসব অভিজ্ঞতা থাকলেই কেউ বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবেন, এমন নয়। দৃশ্যমান কোনো বড় সমস্যা না থাকলেও বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক অস্বস্তি ও ভুল ধারণা অনেককে সাহায্য চাইতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। কেউ কাউন্সেলিং নেওয়ার কথা গোপন রাখেন, কেউ পরিবারের কাছে নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না। আবার ‘এত ভাবো কেন’ বা ‘সবার জীবনেই সমস্যা আছে’—এমন মন্তব্য তাঁদের আরও নিঃসঙ্গ করে তুলতে পারে।
পরিবারে আবেগ প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলিং সেবা সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন?
পরিচিত কারও আচরণে দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তন দেখলে বিচার না করে কোমলভাবে কথা বলুন। বলতে পারেন, ‘তোমাকে কিছুদিন ধরে চিন্তিত মনে হচ্ছে। চাইলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো।’ তিনি কথা বললে মন দিয়ে শুনুন। তাঁর কষ্টকে ছোট করবেন না কিংবা নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করে তা উড়িয়ে দেবেন না।
প্রয়োজনে পেশাগত সহায়তা নিতে উৎসাহ দিন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া বা চিকিৎসকের কাছে সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাবও দিতে পারেন। শুধু একবার নয়, নিয়মিত খোঁজ নিন এবং তাঁর ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করুন।
কেউ যদি নিজের ক্ষতি করার কথা বলেন, বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে না পান কিংবা আত্মহত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, বিষয়টিকে জরুরি হিসেবে নিতে হবে। তাঁকে একা না রেখে নিরাপদভাবে পাশে থাকুন এবং দ্রুত পেশাগত সহায়তা নিন। তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা থাকলে বাংলাদেশে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করুন অথবা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
চিকিৎসা রয়েছে
বিষণ্নতার কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব। ব্যক্তির উপসর্গ ও প্রয়োজন অনুযায়ী মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা, প্রমাণভিত্তিক থেরাপি এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। নিয়মিত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা এবং প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগও সুস্থতায় সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু ইতিবাচক চিন্তা করা বা হাসিখুশি থাকার চেষ্টা সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। নিজে থেকে ওষুধ শুরু করা বা বন্ধ করাও উচিত নয়।
মানুষের বাহ্যিক আচরণ দেখে তার মনের অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। যে মানুষটি অন্যদের হাসান, তাঁরও কষ্ট থাকতে পারে। যে মানুষটি সবার পাশে দাঁড়ান, তাঁরও সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই কাউকে ‘তুমি কেমন আছ’ জিজ্ঞাসা করার পাশাপাশি তাঁর উত্তর শোনার মানসিক প্রস্তুতিও রাখতে হবে। তিনি যদি বলেন, ‘ভালো নেই’, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ না দিয়ে তাঁর পাশে বসুন। সব সমস্যার সমাধান আমাদের হাতে নেই, কিন্তু একজন মানুষকে কষ্টের সময়ে একা না রাখার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে আছে।
অনেক সময় মানুষের প্রয়োজন উপদেশ নয়, বিচার নয়, জোর করে হাসিখুশি থাকার নির্দেশও নয়। প্রয়োজন এমন একটি নিরাপদ সম্পর্ক, যেখানে তিনি নির্ভয়ে বলতে পারবেন, ‘আমি ভালো নেই।’ সেই সুযোগ তৈরি করাই হতে পারে মানসিক সুস্থতার পথে প্রথম পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (NHS) এবং WHO-এর মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা।