একদিন মনে হচ্ছে, অনেক কিছু করা সম্ভব। নতুন পরিকল্পনা, কাজের আগ্রহ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদে মন ভরে আছে। অথচ কয়েকদিন পরেই সবকিছু অর্থহীন মনে হতে পারে। কথা বলতে ইচ্ছে করে না, পরিচিত মানুষদের এড়িয়ে চলতে মন চায়, দৈনন্দিন কাজও কঠিন হয়ে ওঠে।
এমন অভিজ্ঞতার অর্থ সব সময় মানসিক রোগ নয়। জীবনের চাপ, ঘুমের অভাব কিংবা ব্যক্তিগত নানা ঘটনার কারণে মানুষের মুড বদলাতে পারে। তবে এই পরিবর্তন যদি অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছায়, দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় এবং স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে, তাহলে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সম্ভাবনাসহ অন্যান্য কারণ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাইপোলার ডিসঅর্ডারে একজন মানুষের মুড ও কর্মশক্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। কখনো অস্বাভাবিক উচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা বিরক্তি দেখা দেয়; আবার কখনো গভীর বিষণ্নতা গ্রাস করতে পারে। এই পরিবর্তন কেবল আনন্দিত থাকা কিংবা মন খারাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—ঘুম, চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও আচরণেও এর প্রভাব পড়ে।
উচ্ছ্বাসের আড়ালেও থাকতে পারে সমস্যা
ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার সময় কেউ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। অল্প ঘুমিয়েও ক্লান্তি অনুভব না করা, দ্রুত কথা বলা, মাথায় একের পর এক চিন্তা আসা, একসঙ্গে অনেক কাজের পরিকল্পনা করা কিংবা নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। কখনো অতিরিক্ত খরচ বা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তও দেখা যায়।
ম্যানিয়া সাধারণত বেশি তীব্র এবং কাজ, সম্পর্ক কিংবা বিচারবোধে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। হাইপোম্যানিয়ার লক্ষণ তুলনামূলক কম তীব্র হলেও তা ব্যক্তির স্বাভাবিক আচরণ থেকে আলাদা হতে পারে। তাই শুধু উচ্ছ্বাস বা কর্মশক্তি বেড়ে যাওয়াকে রোগের লক্ষণ ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে উপেক্ষা করাও উচিত নয়।
বিষণ্নতা শুধু মন খারাপ নয়
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের বিষণ্নতার পর্বে দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, শূন্যতা, ক্লান্তি এবং আগের পছন্দের কাজে আনন্দ হারিয়ে যেতে পারে। ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস বদলে যেতে পারে, মনোযোগ কমে যেতে পারে এবং নিজেকে অসহায় বা মূল্যহীন মনে হতে পারে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেন, দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনেও অসুবিধা অনুভব করেন।
মৃত্যু বা আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দিলে দ্রুত সহায়তা নেওয়া জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিকে একা না রাখা, বিশ্বস্ত কাউকে জানানো এবং নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
কেন বদলায় মুড?
মানসিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক অনিশ্চয়তা, ঘুমের ঘাটতি, শারীরিক অসুস্থতা ও হরমোনের পরিবর্তন মুডকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনো বাস্তব ঘটনার পর মন খারাপ হওয়া কিংবা ভালো খবর পেয়ে আনন্দিত হওয়া স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে মুডের পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে তীব্র ও স্থায়ী হতে পারে। কখনো স্পষ্ট কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াও এমন পর্ব দেখা দিতে পারে। তবে এই পার্থক্য দিয়ে একা রোগ নির্ণয় করা যায় না; চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কখন সতর্ক হবেন?
মুডের পরিবর্তন বারবার হলে, কয়েকদিন ধরে অস্বাভাবিক উচ্ছ্বাস বা বিষণ্নতা চলতে থাকলে, ঘুমের প্রয়োজন অনেক কমে গেলে কিংবা কাজ, পড়াশোনা, সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সমস্যা দেখা দিলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। একই ধরনের লক্ষণ অন্য মানসিক বা শারীরিক সমস্যাতেও দেখা দিতে পারে। তাই নিজে নিজে রোগ নির্ধারণ না করে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন করানোই সঠিক পথ।
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ওষুধ, সাইকোথেরাপি, নিয়মিত ঘুম এবং দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মুড ও ঘুমের পরিবর্তন লিখে রাখলে চিকিৎসককে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে সুবিধা হতে পারে। পরিবারের সহানুভূতি ও সহযোগিতাও সহায়ক। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
সহানুভূতিই হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ
মানসিক সমস্যায় থাকা কাউকে ‘পাগল’, ‘অলস’ বা ‘নাটক করছে’ বলে আঘাত করা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বরং তার কথা শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহিত করা দরকার।
মুডের ওঠানামা মানেই বাইপোলার ডিসঅর্ডার নয়। কিন্তু পরিবর্তন যখন অস্বাভাবিক, দীর্ঘস্থায়ী কিংবা দৈনন্দিন জীবনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, তখন তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং কাছের মানুষের সহমর্মিতা একজন মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে তুলতে পারে।