প্রতিদিনের খাবারে ভাত, রুটি, ফল ও সবজি থাকলেই কি শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে? বিজ্ঞানীদের একাংশের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক দশকে কিছু প্রধান খাদ্যশস্য, ফল ও সবজিতে খনিজ ও প্রোটিনের ঘনত্ব কমেছে। এর অর্থ এই নয় যে সব খাবারের পুষ্টিমান একই হারে কমেছে। তবে খাদ্যের পরিমাণের পাশাপাশি গুণমানের দিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চার্সের একটি বিশ্লেষণে দীর্ঘ সময়ের খাদ্য উপাদানের তথ্য এবং বহু বছরের গমের নমুনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে গম, গাজর, আপেল, মটর ও অন্যান্য সাধারণ খাবারে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ঘনত্ব কমার প্রবণতা তুলে ধরা হয়। ব্রিটেনে ফল ও সবজির পুষ্টি উপাদান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কিছু তুলনাতেও আয়রন, তামা ও ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা হ্রাসের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে গবেষণার সময়কাল, নমুনা ও পদ্ধতি ভেদে ফলাফল আলাদা হতে পারে।
পুষ্টির ঘাটতি শরীরে নানা ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। দস্তা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ক্ষত নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। ম্যাগনেশিয়াম পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিঘাটতি প্রতিরোধে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
ফসলের পুষ্টিগুণে পরিবর্তনের পেছনে কৃষিজমির মাটির অবস্থাকে অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়া, পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যহীনতা এবং মাটির অণুজীবের বৈচিত্র্য নষ্ট হলে গাছের পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে। অতিরিক্ত বা অপরিকল্পিত সার ব্যবহারের পরিবর্তে মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা জরুরি।
ফলন বাড়ানোর প্রতিযোগিতাও এ আলোচনার অংশ। উচ্চফলনশীল জাতের মাধ্যমে কম জমিতে বেশি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছের শস্য বা ফলের আকার ও মোট ভর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট খনিজের ঘনত্ব তুলনামূলক কমে যেতে পারে। এই প্রবণতাকে ‘ডাইলিউশন ইফেক্ট’ বলা হয়। তবে সব উচ্চফলনশীল জাতেই এমনটি ঘটে, বিষয়টি তা নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও উপেক্ষা করা যায় না। কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত তাপ, খরা ও লবণাক্ততা ফসলের বৃদ্ধি এবং পুষ্টি গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। কোন ফসলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটবে, তা পরিবেশ ও চাষের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।
পুষ্টির এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘লুকানো ক্ষুধা’। পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ না পেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। আয়রন, আয়োডিন, ফলেট, ভিটামিন এ ও দস্তার ঘাটতি বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য কম থাকা কিংবা পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত কেনার সামর্থ্য না থাকাও কিছু মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি উৎপাদনের লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিমাণ ও পুষ্টিগুণ—দুটিই। মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, জৈব সার ও সবুজ সারের ব্যবহার, ফসল পর্যায়ক্রমে চাষ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। পুষ্টি বর্ধিত ফসলের চাষ এবং স্থানীয় শস্যের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও সহায়ক হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাও জরুরি। প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, ডাল, বাদাম, বীজ, মৌসুমি ফল এবং বিভিন্ন ধরনের শস্য রাখার চেষ্টা করুন। শুধু ভাত বা গমের ওপর নির্ভর না করে সামর্থ্য অনুযায়ী খাবারের বৈচিত্র্য বাড়ান। শরীরে পুষ্টির ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে সম্পূরক ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
খাদ্য নিরাপত্তা মানে শুধু পর্যাপ্ত খাবার উৎপাদন বা সরবরাহ নয়; সেই খাবার শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ মাটি ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল নিশ্চিত করার উদ্যোগ তাই কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।