কাওয়ালির কিংবদন্তি ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে বসেছিল সংগীতের বিশেষ আয়োজন। সেখানে নুসরাতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গান পরিবেশন করেন তাঁর ভাতিজা রাহাত ফতেহ আলী খান ও রাহাতের ছেলে শাহজামান ফতেহ আলী খান। তাঁদের কণ্ঠে উঠে আসে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার কথা।
জিও নিউজের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আয়োজনে পাকিস্তানি ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত দর্শকদের পাশাপাশি শিখ সম্প্রদায়ের বহু সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও যোগ দেন কিংবদন্তি এই শিল্পীর সংগীতজীবন স্মরণ করতে।
অনুষ্ঠানে রাহাত ফতেহ আলী খানের সঙ্গে দর্শকদের সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল অন্যতম আকর্ষণ। পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক ও সংগীতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় রাহাত বলেন, যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান নয়। মানুষ শান্তি ও ভালোবাসা চায়। সংগীতের মাধ্যমে সেই আকাঙ্ক্ষার কথাই সবার কাছে পৌঁছে দিতে চান তিনি।
তাঁর মতে, সংগীতের কোনো সীমানা নেই। ধর্ম, ভাষা কিংবা জাতীয় পরিচয় দিয়ে সংগীতকে ভাগ করা যায় না। কাওয়ালির দীর্ঘ ঐতিহ্য মানুষকে আধ্যাত্মিকতা, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। শিল্পী হিসেবে এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে বিশ্বজুড়ে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য।
চাচা নুসরাতের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হন রাহাত। তিনি বলেন, নুসরাতের ব্যক্তিত্ব ও সংগীতের অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরতে একটি আয়োজন যথেষ্ট নয়। তাঁর কাছ থেকে সংগীতের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের সম্মান করার শিক্ষাও পেয়েছেন রাহাত। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সেই শিক্ষা অনুসরণ করেছেন বলে জানান তিনি।
নুসরাতের সংগীতের উত্তরাধিকার ধরে রাখার বিষয়ে শাহজামান বলেন, কিংবদন্তি এই শিল্পীর সমকক্ষ হওয়ার যোগ্যতা নিজের মধ্যে দেখেন না তিনি। তবে তাঁর গানে শ্রোতারা যদি নুসরাতের গায়কির সামান্য ছায়াও খুঁজে পান, তা হবে বড় প্রাপ্তি। পরিবারের প্রায় ৩০০ বছরের কাওয়ালি ঐতিহ্য এগিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করছেন বলেও জানান তিনি।
শাহজামানের ভাষ্য, তাঁর বাবা রাহাত ফতেহ আলী খান নুসরাতের সংগীতধারাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করেছেন। এখন সেই উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদের। এ জন্য ভক্তদের ভালোবাসা ও দোয়া কামনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বাবা ও ছেলে নুসরাতের স্মরণে কাওয়ালি পরিবেশন করেন। দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে তাঁরা নুসরাতের রেকর্ড করা শেষ সেহরাও পরিবেশন করেন। সংগীত পরিবেশনার পর দর্শকদের কাছ থেকে প্রশংসা ও করতালি পান তাঁরা। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কেক কাটার আয়োজনও ছিল অনুষ্ঠানে।
পাকিস্তানি ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সংগীত ও বিনোদন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত আমির মাখানি ও রেহান সিদ্দিকি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কনসার্ট সফরে রয়েছেন রাহাত ফতেহ আলী খান। সফরের অংশ হিসেবে আগামী ১৬ অক্টোবর ডালাসের কাছে ফ্রিসকোতে তাঁর সংগীত পরিবেশনের কথা রয়েছে। এর মধ্যেই ডালাসে চাচার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সময় কাটান তিনি।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের প্রয়াণের প্রায় তিন দশক পরও তাঁর কাওয়ালি মানুষের হৃদয়ে জায়গা ধরে রেখেছে। ডালাসের এ আয়োজন প্রমাণ করেছে, তাঁর সংগীত কেবল একটি পরিবারের ঐতিহ্য নয়; এটি উপমহাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও মানুষের পারস্পরিক বন্ধনেরও অংশ।