জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) একটি নাম কিংবা জন্মতারিখ সংশোধন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক নাগরিক। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দালালচক্র। অভিযোগ রয়েছে, এক বছরের বয়স পরিবর্তনে ১০ হাজার টাকা, চার-পাঁচ বছরের পরিবর্তনে ৫০ হাজার টাকা এবং বড় ধরনের সংশোধনে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। শুধু তথ্য সংশোধন নয়, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ ও বেচাকেনার অভিযোগও উঠেছে। এতে কোটি মানুষের পরিচয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে আবেদন করার পর দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতাকে পুঁজি করে দালালরা দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ দাবি করে। অনেকে টাকা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না; বরং প্রতারণার শিকার হন। এনআইডি সংশোধনের নামে অর্থ আদায়, ভুয়া তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি এবং আবেদনকারীদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
সংশোধনে লাখ টাকা দাবি
নাম, বয়স, জন্মতারিখ কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দালালদের সঙ্গে দর-কষাকষির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশোধনের ধরন ও পরিমাণ বিবেচনায় দাবির অঙ্ক কয়েক হাজার টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ও দায়ীদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।
ভুল বা জাল নথির ভিত্তিতে এনআইডির তথ্য পরিবর্তন করা হলে এর প্রভাব পড়তে পারে পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির মালিকানা ও অন্যান্য নাগরিক সেবায়। ফলে তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম শুধু আবেদনকারীর আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
এনআইডি তথ্যভান্ডার থেকে নাগরিকদের স্পর্শকাতর তথ্য অননুমোদিতভাবে সংগ্রহ ও বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এসব তথ্য অপরাধীদের হাতে পৌঁছালে পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তথ্য পাচারের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা-ও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহি জরুরি। কে কোন তথ্য দেখছেন, কী কারণে দেখছেন এবং তথ্য পরিবর্তনের অনুমোদন কে দিয়েছেন—এসব বিষয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। অনিয়ম শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তথ্য ফাঁসের উৎসও চিহ্নিত করতে হবে।
এনআইডি সংশোধনপ্রক্রিয়া সহজ করা, আবেদনের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা কার্যকর রাখা এবং সরকারি ফি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হলে দালালদের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও অপরিচিত ব্যক্তির হাতে মূল কাগজপত্র তুলে দেওয়া কিংবা নির্ধারিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
কোটি মানুষের পরিচয় বহনকারী এনআইডি ব্যবস্থায় অনিয়ম ও তথ্য বেচাকেনার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডারের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রতিকার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে।