বরগুনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংকট ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। কোথাও দুই শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন পাঁচজন শিক্ষক, কোথাও দুপুরের পর শ্রেণিকক্ষ পড়ে আছে একেবারে ফাঁকা। কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি ও পাঠদান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিভাবকদের একাংশ বলছেন, সরকারি বিদ্যালয়ে আস্থা কমে যাওয়ায় সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন তাঁরা।
বরগুনা সদর উপজেলার মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দর ভবন ও সাজানো শ্রেণিকক্ষ থাকলেও শিক্ষার্থী মাত্র দুজন। পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তিনজন। তবে প্রধান শিক্ষক বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। পাশের চড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচজন। সেখানে দুই শিক্ষিকা উপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন।
মধ্য পাঠাকাটা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুন নাহার বলেন, এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় শিক্ষার্থীরাও ভাগ হয়ে যাচ্ছে। চড়পাড়া বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. পারভীন বলেন, শিক্ষার্থী কম হলেও শিক্ষকদের পুরো সময় বিদ্যালয়ে থাকতে হয়। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক সংকটও রয়েছে।
পূর্ব হোসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষকের মধ্যে দুজনকে উপস্থিত পাওয়া যায়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাকে খালি শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের ওপর ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ হাজিরা খাতায় চারজনের স্বাক্ষর ছিল। ওই বিদ্যালয়ে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঁচ শিক্ষার্থীকে একই কক্ষে একসঙ্গে পড়াচ্ছিলেন একজন শিক্ষক।
দুপুর আড়াইটার দিকে উত্তর দেশান্তরকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। উপস্থিত ছিলেন একজন শিক্ষক। পাশের সর্দারপাড়া হাবিবুর রহমান চানমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষার্থী উপস্থিতির চিত্র ছিল প্রায় একই রকম।
উত্তর দেশান্তরকাঠী বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাজিয়া সুলতানা বলেন, অভিভাবকদের অনেকে মাদ্রাসার দিকে ঝুঁকছেন। সরকারি বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নিয়ে নেতিবাচক ধারণাও শিক্ষার্থী কমার অন্যতম কারণ। সর্দারপাড়া বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, কিন্ডারগার্টেনে প্রাক-প্রাথমিক থেকেই ইংরেজির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের সেখানে ভর্তি করছেন। সরকারি স্কুলকে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার প্রবণতাও রয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের দুর্বলতা, নির্ধারিত সময়ের আগে ছুটি এবং তদারকির ঘাটতি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা কমিয়েছে। শিক্ষার্থীর মা মরিয়ম বলেন, শিশুদের প্রতি যত্ন ও পড়াশোনার মান বাড়ানো গেলে অভিভাবকদের আস্থা ফিরতে পারে।
শিক্ষার্থীর বাবা সেলিম জানান, সরকারি বিদ্যালয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত থাকতে হয়। অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যালয়ে কম সময়ের মধ্যে পড়াশোনার মান ভালো বলে মনে করায় বাড়তি খরচ করেও সন্তানদের সেখানে পড়াচ্ছেন অভিভাবকদের কেউ কেউ। আরেক মা রিক্তা বলেন, বাড়ির পাশে সরকারি বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের কিন্ডারগার্টেনে সন্তানকে নিয়ে যেতে হচ্ছে। তার মতে, শিক্ষক সংকট দূর ও শিক্ষার মান উন্নত করা জরুরি।
জেলার প্রাথমিক শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১ হাজার ৪৫টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় ৭৯৯টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৮১ হাজার ৯০০ জন। শিক্ষক পদ মঞ্জুর রয়েছে ৫ হাজার ৪৭টি। তবে কতটি পদ শূন্য রয়েছে, সে তথ্য মূল প্রতিবেদনে অসম্পূর্ণ।
শিক্ষার্থী সংকটের কারণ হিসেবে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা, বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার এবং অভিভাবকদের পছন্দের বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখতে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।