বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ বরিশাল। কীর্তনখোলার তীরে গড়ে ওঠা এই নগরীর পরিচিতি শুধু নদী, খাল, সবুজ প্রকৃতি কিংবা ইতিহাসসমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে নয়; এখানকার পুরোনো স্থাপনা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির ইতিহাসও বরিশালকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা। নগরীর এমনই এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন অক্সফোর্ড মিশন চার্চ। লাল ইটের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য আর দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই গির্জা বরিশালের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস
বরিশাল শহরের বগুড়া রোড এলাকায় অবস্থিত এই স্থাপনাটির আনুষ্ঠানিক নাম এপিফানি চার্চ। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি অক্সফোর্ড মিশন চার্চ নামেই বেশি পরিচিত। উনিশ শতকের শেষভাগে ইংল্যান্ডভিত্তিক অ্যাংলিকান মিশনারি সংগঠন অক্সফোর্ড মিশন এ অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ১৮৯৫ সালে গঠিত হয় ব্রাদারহুড অব দ্য এপিফানি। পরবর্তী সময়ে ১৯০২ সালে ফাদার ই. এল. স্ট্রংয়ের নেতৃত্বে এখানে গড়ে ওঠে সিস্টারহুড।
গির্জাটির নির্মাণের ইতিহাসও বেশ আকর্ষণীয়। সিস্টার এডিথ ল্যাংরিজের আঁকা নকশার ভিত্তিতে ১৯০৩ সালের ২৬ জানুয়ারি এটি উদ্বোধন করা হয়। পরে ফাদার ই. এল. স্ট্রংয়ের তত্ত্বাবধানে স্থাপনাটির নির্মাণ ও নকশার কাজ আরও পরিপূর্ণতা পায়। ১৯০৭ সালে নির্মাণের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন হয়। প্রকৌশলগত দায়িত্বে ছিলেন ফ্রেডেরিক ডগলাস।
স্থাপত্যে মুগ্ধতার ছাপ
অক্সফোর্ড মিশন চার্চের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর স্থাপত্যশৈলী। লাল ইটের বিশাল ভবন, দৃষ্টিনন্দন খিলান, উঁচু কাঠামো এবং চারপাশের সবুজ পরিবেশ একে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। বাইরে থেকে ভবনটিকে কয়েকতলা মনে হলেও মূল প্রার্থনাকক্ষটি একতলাবিশিষ্ট বিশাল হলঘর।
স্থাপনাটিতে রয়েছে প্রায় ৪০টি খিলান। ভেতরের কাঠের কারুকাজ, মার্বেল পাথরের মেঝে এবং সুশৃঙ্খল প্রার্থনাকক্ষ স্থাপত্যের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রধান বেদিতে রয়েছে একটি বড় ক্রুশ, যা বেথলেহেম থেকে আনা হয়েছে বলে প্রচলিত তথ্য রয়েছে।
প্রায় ৩৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মিশন প্রাঙ্গণটি উঁচু সীমানাপ্রাচীর ও সারি সারি পামগাছে ঘেরা। এখানে রয়েছে পুকুর, শিক্ষা ও আবাসিক স্থাপনা। শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে এই পরিবেশ দর্শনার্থীদের মনে প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করে।
শুধু গির্জা নয়, শিক্ষা ও মানবসেবার ইতিহাস
অক্সফোর্ড মিশনের ইতিহাস কেবল ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ অঞ্চলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখে মিশনটি। তাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে বিদ্যালয়, শিক্ষার্থীদের আবাসন, অনাথ আশ্রম ও চিকিৎসাকেন্দ্র। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সিস্টার এডিথ ল্যাংরিজের নেতৃত্বাধীন সিস্টারহুড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বরিশালের শিক্ষা ও সামাজিক বিকাশের ইতিহাসে এসব উদ্যোগের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে নানা পরিবর্তন এলেও এই মিশনের ঐতিহাসিক অবদান স্থানীয় জনজীবনের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
সম্প্রীতির এক ঐতিহাসিক সাক্ষী
বাংলাদেশের সমাজজীবনে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অক্সফোর্ড মিশন চার্চ সেই ইতিহাসেরও একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। শতাধিক বছর ধরে স্থাপনাটি ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের আকর্ষণ হিসেবে পরিচিতি ধরে রেখেছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও এর ঐতিহাসিক কাঠামো টিকে থাকা একে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
যেভাবে ঘুরে দেখবেন
বরিশাল নগরীর বগুড়া রোডে অবস্থিত অক্সফোর্ড মিশন চার্চে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে সহজেই যাওয়া যায়। দর্শনার্থীরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এর ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখতে পারেন। তবে এটি একটি সক্রিয় উপাসনালয় হওয়ায় প্রার্থনার সময় নীরবতা বজায় রাখা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
ঐতিহ্য সংরক্ষণে সচেতনতা জরুরি
সময়ের সঙ্গে অনেক পুরোনো স্থাপনা হারিয়ে যাচ্ছে। অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সংরক্ষণের অভাবে ইতিহাসের বহু স্মারক হারানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় অক্সফোর্ড মিশন চার্চের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়, বরং বরিশালবাসীরও সম্মিলিত দায়িত্ব।
অক্সফোর্ড মিশন চার্চের প্রতিটি ইট, খিলান ও প্রাচীন স্থাপত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস তুলে ধরা গেলে তারা নিজেদের এলাকার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে এবং সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করবে। কীর্তনখোলার তীরের বরিশালকে জানতে হলে তাই এই লাল ইটের ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকেও জানতে হবে।



