মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে এবার সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা নিতে চাইছে চীন। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের অবসানে আলোচনার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। এ লক্ষ্যে সোমবার (২ নভেম্বর) বেইজিংয়ে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। একই দিনে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিককে রাষ্ট্রীয় সফরে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপসচিব আলী বাঘেরি কানির সঙ্গে বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, সংঘাতের অবসানে রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নেই। তার মতে, আলোচনার মাধ্যমেই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে ইরানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থনের কথাও তুলে ধরেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে বর্তমান সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি।
আল জাজিরার বেইজিং প্রতিনিধি ক্যাটরিনা ইউয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ইরানি অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা বেইজিং। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যস্থতায় চীনের তৎপরতা কিছু সময় তুলনামূলক কম ছিল। এখন পরিস্থিতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখার আগ্রহ বাড়ছে দেশটির।
এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত ঝাই জুন ইরান, ওমান ও সৌদি আরব সফর করবেন বলে জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে ওমানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাকেও মধ্যপ্রাচ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে বেইজিং। ১৯৭৮ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর প্রথমবারের মতো কোনো ওমানি রাষ্ট্রপ্রধান চীন সফরে গেলেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
শি জিনপিং বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলকে পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াই কিংবা ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত করা উচিত নয়। তার বক্তব্যে আঞ্চলিক দেশগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব উঠে আসে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে ওমানের গুরুত্ব
বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির কাছে ওমানের অবস্থান দেশটিকে বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। সংঘাতের কারণে এই জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ার আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার বিবেচনায় ওমানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বেইজিং। শি জিনপিং দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
সুলতানের সফরে দুই দেশের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতে ১৪টি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি একটি মুদ্রা বিনিময় চুক্তিও হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে নৌযান চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে চীন ও ওমান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ওমানের কৌশলগত অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দেশটির একাধিক বন্দর হরমুজ প্রণালির বাইরে থাকায় বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় সেগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা, ওমানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ দূতের সফর—এই তিন উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংকট নিরসনে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে চীন।
সূত্র: আল জাজিরা



