দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশের প্রধান লক্ষ্য এখন চাকরি পাওয়া। অথচ চাকরির বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বেকারত্ব মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। কারণ একজন উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই নিশ্চিত করেন না, বরং অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেন।
দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প ও সেবামূলক খাতে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও গতিশীল হবে।
তবে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ থাকলেও অনেক তরুণ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগ শুরু করতে পারছেন না। পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব, ব্যবহারিক জ্ঞানের ঘাটতি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না পাওয়া, বাজারজাতকরণের জটিলতা এবং অভিজ্ঞ পরামর্শকের অভাব তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার অনেক তরুণের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা বা আগ্রহও তৈরি হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে চাকরিনির্ভর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, বাজার বিশ্লেষণ ও নেতৃত্বের মতো বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে। এতে শিক্ষাজীবন থেকেই তাদের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার মানসিকতা তৈরি হবে।
নারী উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পণ্য বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে নারীরা আরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন। এতে তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বাড়ার পাশাপাশি পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং পণ্য ও সেবার বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি মোকাবিলা ও উদ্যোগ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা জরুরি।
বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় শক্তি। এই জনগোষ্ঠীর মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারলে তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন। তবে এ জন্য প্রয়োজন উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ, যথাযথ নীতিসহায়তা এবং উদ্যোগ গ্রহণে সামাজিক উৎসাহ।
মনে রাখতে হবে, সবাই চাকরি পাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ ও সহযোগিতা পেলে অনেক তরুণ নিজেরাই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারেন। তাই তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মানসিকতা ও উদ্যোগ তৈরি করতে হবে। চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোগী হওয়ার এই সংস্কৃতিই হতে পারে বেকারত্ব কমানো ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম পথ।