ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি ঘিরে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসেছিল চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান। সেই একই ধরনের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশও কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের জে-১০ সিই মাল্টিরোল ফাইটার কেনার পরিকল্পনা সামনে আসার পর বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযান ঘিরে পাকিস্তান দাবি করেছিল, তাদের হামলায় ভারতের অন্তত পাঁচটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার প্রথম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে এ দাবি জানান।পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ আইএসপিআরের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী দাবি করেন, ভূপাতিত পাঁচটি বিমানের মধ্যে তিনটি রাফাল, একটি সুখোই এবং একটি মিগ-২৯ ছিল।
বিবিসি ভেরিফায়েড জানিয়েছিল, ভারতের পাঞ্জাবের একটি কৃষিজমিতে রাফাল যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং সেগুলো সরানোর কাজে ভারতীয় সেনাসদস্যদের দেখা গেছে।ফ্রান্সের ডাসোঁ অ্যাভিয়েশনের তৈরি রাফালকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, চীনের তৈরি জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেই রাফালসহ ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল।বাংলাদেশও চীন থেকে এই জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তির খসড়া প্রস্তুত হয়েছে।
বাংলাদেশের চীনা যুদ্ধবিমান ব্যবহারের ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরোনো। ১৯৭৭ সালে চীন থেকে এফ-৬ যুদ্ধবিমান কেনে বাংলাদেশ। ঢাকার বিজয় সরণি থেকে জিয়া উদ্যানের দিকে যাওয়ার পথে রাস্তার মোড়ে যে মাঝারি আকারের যুদ্ধবিমান প্রদর্শন করা হয়, সেটিও এ ধরনের একটি বিমান। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেটিকে উন্মুক্ত প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। চীনে এফ-৬ ‘জে-সিক্স’ নামেও পরিচিত।তবে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধবিমান এসেছিল চীন থেকে নয়, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশকে বিনামূল্যে কয়েকটি মিগ-২১ যুদ্ধবিমান উপহার দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী জানান, ওই মিগ-২১ বিমানগুলো ছিল একেবারে নতুন। কারখানা থেকে বের হওয়ার পরই বাংলাদেশ সেগুলো পেয়েছিল। সে সময় রাশিয়ার বাইরে বাংলাদেশই প্রথম এই বিমান পেয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য, যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি এসব বিমানের সঙ্গে মিসাইল, বোমা ও রকেটও দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধের পর বিমানবাহিনীর ঘাঁটিগুলো পুনর্গঠন এবং প্রশিক্ষণের জন্য ব্যাচের পর ব্যাচ সদস্যকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়।পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে চীন। ১৯৭৭ সালে এফ-৬ এবং পরে আশির দশকে এফ-৭ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।এরপর ১৯৯৯ সালে রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কেনে বাংলাদেশ। সে সময় এগুলো বিশ্বের অন্যতম আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত ছিল।তবে ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান বহরের বড় একটি অংশ পুরোনো হয়ে গেছে। কিছু বিমান কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং কিছু পুরোনো বিমানও ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারিভাবে বিমানবাহিনীর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না।
সামরিক তথ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশ’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে মোট ২১২টি বিমান রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান ৪৪টি। এসবের মধ্যে রাশিয়ার আটটি মিগ-২৯ এবং চীনের ৩৬টি এফ-৭ রয়েছে।এ ছাড়া রাশিয়ার তৈরি ১৪টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান রয়েছে, যেগুলো হালকা আক্রমণেও ব্যবহার করা যায়। চীনের এফটি-৭ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের লকহিডের দুটি সিরিজের কৌশলগত পরিবহন বিমানও রয়েছে।বিমানবাহিনীতে ৭৩টি হেলিকপ্টার থাকার তথ্যও দিয়েছে ওয়েবসাইটটি। এর মধ্যে রাশিয়ার এমআই সিরিজের ৩৬টি হেলিকপ্টার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সেসনা ও বেলের বিভিন্ন মডেলের হেলিকপ্টার রয়েছে আরও ২৪টি।এ ছাড়া ফ্রান্স, ইতালি ও চেক প্রজাতন্ত্র থেকে কেনা প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারও ব্যবহার করছে বাংলাদেশ।
ওই তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে ৪৪টি ড্রোন রয়েছে। এর মধ্যে স্লোভেনিয়ায় তৈরি ব্রামর সি-ফোর-আই ড্রোন ৩৬টি এবং তুরস্কের বায়রাক্তার টিবি-২ রয়েছে ছয়টি। গত বছর এসব ড্রোন বাংলাদেশের বহরে যুক্ত হয়।বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার বলেন, বাংলাদেশের মিগ-২৯ তুলনামূলকভাবে আধুনিক হলেও বর্তমান সময়ের বিচারে এটিও পুরোনো। বাকি যুদ্ধবিমানগুলো আরও পুরোনো থ্রি-জি প্রযুক্তির। অথচ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির স্টেলথ যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মনে করেন।তার মতে, চীন থেকে যে নতুন যুদ্ধবিমান আনা হচ্ছে, সেগুলো ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি প্রযুক্তির।
শুধু যুদ্ধবিমান কিনলেই কি আধুনিক হবে বিমানবাহিনী?বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীনের ২০টি অত্যাধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব বিমান আকাশ প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে ব্যবহার করা যায়।
এয়ার-টু-এয়ার সক্ষমতার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান মোকাবিলা করা সম্ভব। এয়ার-টু-গ্রাউন্ড সক্ষমতার কারণে স্থলভাগের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো যায়। আবার ক্লোজ এয়ার সাপোর্টের মাধ্যমে স্থলযুদ্ধে থাকা সেনাদের সহায়তা করা সম্ভব। পাশাপাশি মেরিটাইম এয়ার সাপোর্টের মাধ্যমে সমুদ্রে নৌবাহিনীকেও সহায়তা দিতে পারে।
একজন সামরিক বিশ্লেষকের মতে, এই ধরনের একটি বিমান একাই একাধিক ধরনের সামরিক ভূমিকা পালন করতে পারে।তবে আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থায় শুধু যুদ্ধবিমান থাকাই যথেষ্ট নয়। রাডার, জ্যামিং প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং বিমান, নৌ ও স্থলবাহিনীর মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।চীনের ওপর এত নির্ভরতা কেন?বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। নৌবাহিনীর সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি অংশ চীন থেকে এসেছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি সাবমেরিনই চীনে তৈরি এবং ২০১৭ সালে সেগুলো নৌবহরে যুক্ত হয়।গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মোট নৌযান ১১৭টি। এর মধ্যে সাতটি ফ্রিগেট ও ছয়টি কর্ভেট রয়েছে।সাতটি ফ্রিগেটের চারটি চীনে, দুটি যুক্তরাষ্ট্রে এবং একটি দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি। ছয়টি কর্ভেটের চারটি চীনা এবং দুটি যুক্তরাজ্যের নির্মিত।ফলে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে জে-১০ সিই যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ কীভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, রাডার ও সমন্বিত সামরিক অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাফাল ভূপাতিতের দাবিতে আলোচিত জে-১০ কিনছে বাংলাদেশ, কতটা বদলাবে বিমানবাহিনী?
ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি ঘিরে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসেছিল চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান। সেই একই ধরনের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশও কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
প্রিয় বাংলাদেশজাতীয়


