রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা মোকাবিলায় বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনায় রয়েছে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে, প্রায় ৩৯ কিলোমিটার ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ৮৮ কিলোমিটার ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণ। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন সেতু নির্মাণ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যপত্রে এসব পরিকল্পনা ও প্রকল্পের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের চলমান ও প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রকল্পের চিত্র উপস্থাপন করা হয়।
কার্যপত্রের তথ্যমতে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সার্বিক অগ্রগতি ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভৌত অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ দুটি প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সাভার ইপিজেড থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ৪৪ কিলোমিটার উড়ালপথে চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। এতে উত্তরাঞ্চল থেকে আসা যানবাহন রাজধানীর অভ্যন্তরে প্রবেশ না করেই দক্ষিণাঞ্চলের দিকে যেতে পারবে।
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়েটি বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া হয়ে ইপিজেড পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে জিটুজি পদ্ধতিতে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সার্ভিস লেন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মোট দৈর্ঘ্য র্যাম্পসহ ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ ইতোমধ্যে যান চলাচলের জন্য চালু রয়েছে। প্রকল্পটির তিনটি ধাপের অগ্রগতিতে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
ঢাকার বাইরে যোগাযোগ সহজ করতে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত দোতলা সড়ক নির্মাণ প্রকল্পও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। এটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা যানবাহন রাজধানীতে প্রবেশ না করেই তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যেতে পারবে।
রাজধানীর বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবে ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বালিয়াপুর থেকে নিমতলী, কেরানীগঞ্জ, ফতুল্লা ও বন্দর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত ৩৯ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮৮ কিলোমিটার ইনার সার্কুলার রিং রোডের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাবওয়ে নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। সমীক্ষায় ১২টি রুটে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু করতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে ৩০৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পায়রা নদীর ওপর ১ হাজার ৬৯০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পটির ব্যয় ১ হাজার ৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকা এবং গত আগস্ট পর্যন্ত অগ্রগতি ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। পাশাপাশি মতলব উত্তর-গজারিয়া সড়কে মেঘনা-ধনাগোদা নদীর ওপর ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি অর্থের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ ঋণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া শরীয়তপুর-চাঁদপুর, ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর এবং বরিশাল-ভোলা রুটে বড় সেতু নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে সারা দেশে ৭৭টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫০ সালের মধ্যে ৫৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেতু, টানেল, উড়ালসড়ক ও বিকল্প সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।




