বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ২০২৬ সালে ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১৯ দশমিক ২, যা দেশটিকে মাঝারি মাত্রার ক্ষুধাপীড়িত শ্রেণিতে রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুধা ও অপুষ্টি কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই গতি কমেছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের তীব্র অপুষ্টির হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
১৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২০। সর্বশেষ মূল্যায়নে তা কমে ১৯ দশমিক ২ হয়েছে। বিপরীতে, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সূচকমানের উন্নতি হয়েছিল ৪২ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ আগের তুলনায় ক্ষুধা কমানোর অগ্রগতির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের হার ২০১৮ সালের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। ২০০০ সালের পর এ হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি তীব্র অপুষ্টির লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ অবস্থায় শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে পুষ্টির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উন্নতিও হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতির হার ২০১৮ সালের ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে অপুষ্টিজনিত খাদ্যঘাটতিতে থাকা মানুষের হার ১২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহারও ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশে নেমেছে।
দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতির হার ছিল ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। সর্বশেষ মূল্যায়নে তা কমে ২৪ শতাংশ হয়েছে। মায়েদের শিক্ষার প্রসার, জীবনযাত্রার মানের উন্নতি, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন এবং জনমিতিক পরিবর্তন এ অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সামনে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৬ সালের সূচকে ভারতের স্কোর ২৪ দশমিক ১, পাকিস্তানের ২৫ দশমিক ৫ এবং আফগানিস্তানের ২৮ দশমিক ৬। দেশগুলো গুরুতর ক্ষুধাপীড়িত শ্রেণিতে রয়েছে। অন্যদিকে নেপালের স্কোর ১৪ দশমিক ৫ এবং শ্রীলঙ্কার ১০ দশমিক ২। দক্ষিণ এশিয়ার গড় স্কোর ২৩ দশমিক ৫, আর বিশ্বব্যাপী গড় ১৮ দশমিক ১।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচক তৈরি করা হয় চারটি প্রধান নির্দেশকের ভিত্তিতে—জনসংখ্যার মধ্যে অপুষ্টিজনিত খাদ্যঘাটতি, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতার তুলনায় কম ওজন, বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা এবং পাঁচ বছর বয়সের আগেই শিশুমৃত্যু। এসব সূচক একটি দেশের ক্ষুধা ও অপুষ্টির সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। শিশুদের তীব্র অপুষ্টির হিসাবের ক্ষেত্রে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য, খর্বাকৃতির ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের জরিপ এবং শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই সূচকটি কোনো একক বছরের পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়।
বিশেষজ্ঞদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে শিশুদের তীব্র অপুষ্টি বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সহায়তা এবং পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য ধরে রাখতে খাদ্যপ্রাপ্তির পাশাপাশি মা ও শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।