জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় রাজধানীর আজিমপুরে মাগরিবের নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী এক প্রত্যক্ষদর্শী।রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে ওই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে তিনি জবানবন্দি দেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম। এ সময় প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।সাক্ষীর বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়। বর্তমানে তিনি ঢাকার লালবাগে বসবাস করেন। তাঁর দুই ছেলে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।জবানবন্দিতে সাক্ষী জানান, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আন্দোলনরত ছাত্রদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেওয়ার পরদিন প্রতিবাদে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে নামে। তাঁর দুই ছেলেও ওই আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালান।

তিনি আরও বলেন, এর পর ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন। তাদের গুলি করে হত্যার জন্য আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের সদস্যদের দায়ী করেন তিনি।সাক্ষী জানান, ১৭ জুলাই নিজের বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজাকে খুঁজতে তিনি নীলক্ষেতে যান। তাঁর ছেলে ঢাকা কলেজের সামনে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কয়েকবার ফোন করার পরও ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি।

ওই দিন তিনিও ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিপরীতে আন্দোলনে অংশ নেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন গুলিতে অনেক আন্দোলনকারী আহত হন। তাদের মধ্যে দুজনকে তিনি পপুলার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।পরদিন ১৮ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন। বিকেলে আজিমপুর মেয়র হানিফ জামে মসজিদের সামনে গিয়ে তিনি পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করতে দেখেছেন বলে দাবি করেন।

জীবন বাঁচাতে তিনি ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বিপরীতে একটি নির্মাণাধীন সরকারি ভবনের তৃতীয় তলায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকে একটি গলির ভেতরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।সাক্ষীর দাবি, তাদের অনেকের হাতে অস্ত্র ছিল এবং তারা পুলিশের সঙ্গে অবস্থান করে গুলি চালাচ্ছিলেন। তিনি তাদের সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বাহিনীর সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন।জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের মসজিদের পেছনে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের সামনে তাঁর ছোট ছেলে ইমতিয়াজ হোসেন ইফতি, তাঁর বন্ধু খালেদ সাইফুল্লাহ, মোহাম্মদ আশরাফুলসহ অনেকে আন্দোলনে ছিলেন। বিকেল ৫টার দিকে সেখানে গুলির ঘটনায় তাঁর ছেলে ইফতি, আশরাফুল, খালেদ সাইফুল্লাহসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন বলে দাবি করেন তিনি।

আন্দোলনকারীরা আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক খালেদ সাইফুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান সাক্ষী। আশরাফুলের ডান চোখে গুলি লাগে এবং এতে তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।সাক্ষীর দাবি, তাঁর ছেলে ইফতিকে হাসপাতাল থেকে ছাত্রলীগের কয়েকজন নিয়ে যায় এবং পরে তাকে নির্যাতন করা হয়। রাত ১১টার দিকে দুই বন্ধু তাকে বাসায় নিয়ে আসেন বলে জানান তিনি।সাক্ষী আরও বলেন, ১৮ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার পর তিনি আবার আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের মসজিদের পেছনে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের সামনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় তাঁর ডান চোখে টিয়ারশেল লাগলে চোখে তীব্র জ্বালা শুরু হয়। তিনি মেয়র হানিফ জামে মসজিদে গিয়ে চোখে পানি দেন। পরে চোখে ঠিকমতো দেখতে না পেলেও সেখানে মাগরিবের নামাজে দাঁড়ান।

জবানবন্দিতে তাঁর অভিযোগ, নামাজ শুরু হওয়ার পর মসজিদের পেছন থেকে মুসল্লিদের লক্ষ্য করে যুবলীগ, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন গুলি চালায়। এতে পেছনের দুই কাতারে নামাজরত অনেক মুসল্লি গুলিবিদ্ধ হন বলে তিনি দাবি করেন।নামাজ শেষে তিনি বাসায় ফিরে যান। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ছেলেকে খুঁজতে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের কলোনিতে যান। সেখানে ২৩ নম্বর ভবনের সামনে দুলাল মোহাম্মদ নামে এক সরকারি কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা দেখেছেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।১৯ জুলাই সকালে বড় ছেলে রেজা বাসায় না থাকায় তাকে খুঁজতে বের হন সাক্ষী। পরে ফোন করে জানানো হয়, রেজা বাসায় ফিরেছে। ওই দিন ফার্মগেটের বাইতুস শরফ জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে তিনি জাহাঙ্গীর গেটে যান।

সেখানে মহাখালী রেলগেটের দিক থেকে গুলির শব্দ শুনতে পান বলে জানান তিনি। পরে গুলির শব্দ কমলে সেখানে গিয়ে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীকে পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের মধ্যে পরিচিত সায়েম খানও ছিলেন। তাঁর বুকে গুলি লেগে শরীর ভেদ করে বের হয়ে যায় বলে সাক্ষী জানান। পরে আন্দোলনকারীদের সহায়তায় তাকে রিকশায় করে হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থও দেন তিনি।এরপর বাড্ডার দিকে যাওয়ার পথে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশকে গুলি করতে দেখেছেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

সাক্ষী আরও দাবি করেন, ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাসায় ফিরে তিনি জানতে পারেন, গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের একটি বৈঠক হয়েছিল। সেখানে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি জানতে পারেন। তাঁর জবানবন্দিতে আরও অভিযোগ করা হয়, আন্দোলন দমনে প্রয়োজনে গুলি করার বিষয়ে কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেনন ওবায়দুল কাদেরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

সাক্ষী তাঁর জবানবন্দিতে দাবি করেন, ওই সিদ্ধান্ত ও পরামর্শের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা ও আহত করেছে।