বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের পরিচয় কেবল ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা বিস্তার, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক সাহসিকতার মধ্য দিয়ে তারা ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। অবিভক্ত বাংলার তেমনই এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। যিনি মানুষের কাছে পরিচিত ‘শেরে বাংলা’ বা ‘বাংলার বাঘ’ নামে।
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশালের সাতুরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এ কে ফজলুল হক। ২০২৬ সালে তার জন্মের ১৫৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। অসাধারণ মেধা, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, বাগ্মিতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে উপমহাদেশের রাজনীতিতে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছিল।
শিক্ষা ও মেধায় অনন্য কৃতিত্ব
শিক্ষাজীবনে ফজলুল হকের কৃতিত্ব ছিল অসাধারণ। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন—তিনটি বিষয়ে অনার্স অর্জন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯৭ সালে আইনশাস্ত্রেও ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
তার শিক্ষাজীবনের একটি বহুল প্রচলিত ঘটনা হলো, গণিত বিষয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা নিয়ে এক বন্ধুর ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য তাকে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এরপর মাত্র ছয় মাসের প্রস্তুতিতে গণিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনা তার অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের পরিচায়ক হিসেবে আলোচিত হয়।
কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা
শেরে বাংলার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল কৃষক ও প্রজাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তৎকালীন বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি জমিদারি প্রথা, ঋণের বোঝা এবং মহাজনি ব্যবস্থার চাপে বিপর্যস্ত ছিল। কৃষকদের এই দুরবস্থা উপলব্ধি করে তিনি কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে তাদের স্বার্থকে রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
১৯৩৭ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার সরকার কৃষকদের ঋণসংকট নিরসনে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেয়। ১৯৩৮ সালের বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটার্স অ্যাক্ট, মানিলেন্ডার্স অ্যাক্ট এবং ঋণ সালিশি বোর্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জমিদারি ও মহাজনি শোষণের বিরুদ্ধে তার রাজনৈতিক অবস্থান সাধারণ কৃষকের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে।
শিক্ষা বিস্তারে অবদান
শিক্ষার প্রসারেও শেরে বাংলার অবদান উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে তিনি উদ্যোগী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নে তার ভূমিকা স্মরণীয়। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ, বর্তমান মাওলানা আজাদ কলেজের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণকে তিনি সমাজের অগ্রগতির অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতেন।
ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক দৃঢ়তা
ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় নিজের অবস্থান তুলে ধরতে কখনো পিছপা হননি ফজলুল হক। আইনজীবী হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে তার প্রতিষ্ঠা ছিল। যুক্তি, বাগ্মিতা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন পরিচিতি পান, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার সাহসী রাজনৈতিক অবস্থান ও জনসম্পৃক্ততার কারণেই ‘শেরে বাংলা’ উপাধি বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে।
তবে তাকে শুধু ব্রিটিশবিরোধী সাহসী নেতা হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণ মূল্যায়ন হবে না। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী রাজনীতিক। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করেছেন এবং উপমহাদেশের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন এ কে ফজলুল হক। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রস্তাব ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরবর্তী সময়ে ভারত বিভাগের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।
১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব দেন তিনি। ওই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের বড় পরাজয় ঘটে। ফজলুল হক পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তে অল্প সময়ের মধ্যেই তার মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
শেষজীবন ও ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন নেতার মাজারে তাকে সমাহিত করা হয়। তার সমাধির পাশে রয়েছেন খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন, মতপার্থক্য ও বিতর্কের মধ্যেও কৃষক-প্রজা আন্দোলন, শিক্ষা বিস্তার এবং উপমহাদেশের রাজনীতিতে তার ভূমিকা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন রাজনীতিকের প্রকৃত পরিচয় কেবল রাষ্ট্রীয় পদে নয়, বরং মানুষের অধিকার ও সমাজের পরিবর্তনে তার অবদানের মধ্যেই নিহিত।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন এমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার নাম বাংলার ইতিহাসে উচ্চারিত হবে সাহস, প্রজ্ঞা, জনসম্পৃক্ততা এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে। তার ১৫৩তম জন্মবার্ষিকীতে এই জননেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।