ইতিহাসের প্রতিটি দিনেই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন এমন কিছু মানুষ, যাদের কর্ম, মেধা ও সৃষ্টিশীলতা সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। কেউ রাজনীতিতে, কেউ সাহিত্য ও সাংবাদিকতায়, কেউ বিজ্ঞান গবেষণায়, আবার কেউ সংগীত ও অভিনয়শিল্পে রেখে গেছেন অনন্য অবদান। ৫ নভেম্বরও তেমন কয়েকজন গুণী মানুষের জন্মদিন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আটজনের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০- ১৯২৫): ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী বাঙালি নেতা ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি দেশবন্ধু নামে পরিচিত ছিলেন। পেশায় ব্যারিস্টার হলেও দেশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। অসহযোগ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের বহু নেতাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
আইডা টারবেল (১৮৫৭-১৯৪৪): সাংবাদিকতায় অনুসন্ধানী ধারার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা আইডা টারবেল ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী লেখক ও সাংবাদিক। বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও একচেটিয়া বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে তিনি পরিচিতি পান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The History of the Standard Oil Company তৎকালীন করপোরেট জগতের নানা অনিয়ম সামনে নিয়ে আসে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ইতিহাসে তার কাজ এখনো বিশেষভাবে আলোচিত।
পল সাবাতিয়ে (১৮৫৪-১৯৪১): রসায়নবিজ্ঞানের ইতিহাসে স্মরণীয় নাম পল সাবাতিয়ে। এই ফরাসি বিজ্ঞানী রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনুঘটকের ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। বিশেষ করে ধাতুর সহায়তায় জৈব যৌগের হাইড্রোজেন সংযোজন পদ্ধতি নিয়ে তার গবেষণা শিল্প ও রসায়নবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। এসব অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯১২ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
উইল ডুরান্ট (১৮৮৫-১৯৮১): বিশ্বসভ্যতা ও দর্শনের ইতিহাস সাধারণ পাঠকের কাছে সহজভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন উইল ডুরান্ট। তিনি ছিলেন মার্কিন ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও লেখক। স্ত্রী এরিয়েল ডুরান্টের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন বিখ্যাত ১১ খণ্ডের গ্রন্থমালা The Story of Civilization। ইতিহাস ও মানবসভ্যতা নিয়ে তাদের দীর্ঘ গবেষণালব্ধ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৮ সালে তারা পুলিৎজার পুরস্কার পান।
জে বি এস হ্যালডেন (১৮৯২-১৯৬৪): জীববিজ্ঞান ও জিনতত্ত্ব গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বিজ্ঞানী জন বার্ডন স্যান্ডারসন হ্যালডেন সংক্ষেপে জে বি এস হ্যালডেন নামে পরিচিত। বিবর্তন, বংশগতি ও জনসংখ্যার জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার গবেষণা আধুনিক বিবর্তনবিজ্ঞানের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। তিনি গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক নির্বাচন ও জিনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক ব্যাখ্যায় কাজ করেন। জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
ভিভিয়েন লেই (১৯১৩-১৯৬৭): বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় অভিনেত্রী ভিভিয়েন লেইয়ের জন্ম ভারতের দার্জিলিংয়ে। অভিনয়শৈলী ও পর্দায় চরিত্র ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। Gone with the Wind চলচ্চিত্রে স্কারলেট ও'হারা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। এই ছবিসহ A Streetcar Named Desire চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দুবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার লাভ করেন।
আর্ট গারফাঙ্কেল (১৯৪১): বিশ্বসংগীতের জনপ্রিয় জুটি সাইমন অ্যান্ড গারফাঙ্কেলের অন্যতম সদস্য আর্ট গারফাঙ্কেল। তাঁর কণ্ঠের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও সুরের মাধুর্য তাঁকে সংগীতপ্রেমীদের কাছে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। পল সাইমনের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি The Sound of Silence, Bridge over Troubled Waterসহ বেশ কিছু জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। সংগীতের পাশাপাশি অভিনয় ও লেখালেখিতেও যুক্ত ছিলেন এই মার্কিন শিল্পী।
ব্রায়ান অ্যাডামস (১৯৫৯) : বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় কানাডীয় সংগীতশিল্পী ব্রায়ান অ্যাডামস রক সংগীতের অন্যতম পরিচিত নাম। গায়ক, গীতিকার ও গিটারবাদক হিসেবে দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। Summer of '69, Heaven এবং (Everything I Do) I Do It for You তার বহুল পরিচিত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে। সংগীতের পাশাপাশি আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।
জন্মদিন কেবল একজন মানুষের পৃথিবীতে আগমনের দিন নয়, তার কর্ম ও অবদান স্মরণ করারও উপলক্ষ। ৫ নভেম্বর জন্ম নেওয়া এই আটজন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিভা, অধ্যবসায় ও সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক সংগ্রাম, আইডা টারবেলের সাংবাদিকতা, বিজ্ঞানীদের গবেষণা কিংবা শিল্পীদের সৃজনশীলতা—সবই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের কাজ ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।




