শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ফলে একাধিক বর্ষের শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়ছে ঢাকা কলেজ। শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, পুরোনো ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।
কলেজের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান ও পরীক্ষা পরিচালনার জন্য রয়েছে ৬৪টি শ্রেণিকক্ষ। মূল ভবন, জুলাই-৩৬ ভবন, উদ্ভিদবিজ্ঞান ভবন ও আইসিটি ভবনে এসব কক্ষ অবস্থিত। এর মধ্যে মূল ভবনে ৩০টি, জুলাই-৩৬ ভবনে ২৩টি, উদ্ভিদবিজ্ঞান ভবনে আটটি এবং আইসিটি ভবনে তিনটি কক্ষ রয়েছে। শেষের তিনটি কক্ষ ইসলামিক স্টাডিজ ও পরিসংখ্যান বিভাগের জন্য নির্ধারিত।
মূল ভবনের ৩০টি কক্ষ ব্যবহার করছে ১৩টি বিভাগ। ফলে প্রতিটি বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত কক্ষের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চমাধ্যমিকের প্রায় ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর পাঠদানও একই অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি অনার্স ও মাস্টার্সের ক্লাস এবং পরীক্ষাও এসব কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
এ পরিস্থিতিতে অনেক বিভাগকে সেমিনার কক্ষের পাশাপাশি অন্য বিভাগের অব্যবহৃত কক্ষের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও জায়গার অভাবে বারান্দাতেও পাঠদান চলছে। শুধু কক্ষের স্বল্পতাই নয়, পুরোনো ভবনের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া, রং উঠে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব শিক্ষার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম তাজওয়ার শাওন জানান, অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের বিভাগে মাত্র দুটি কক্ষ রয়েছে। একটি কক্ষে সর্বোচ্চ ২০ জনের বসার ব্যবস্থা থাকায় বড় ক্লাস পরিচালনা করা কঠিন। অনেক সময় অন্য বর্ষের ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। কক্ষ খালি না পেলে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কক্ষেও পাঠদান করতে হয় বলে জানান তিনি।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহিমের অভিযোগ, পাঁচটি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পাঠদান পরিচালনার জন্য বিভাগটিতে নিজস্ব শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা নিতে অন্য বিভাগের ফাঁকা কক্ষের সন্ধান করতে হয়। এ ছাড়া পুরোনো কক্ষগুলোতে বেঞ্চ, বৈদ্যুতিক পাখা ও আলোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এসব সমস্যা সমাধানে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও বিদ্যমান অবকাঠামো সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী পিয়াস করিম জানান, শ্রেণিকক্ষের অভাবে তাদের বিভাগে বারান্দায় বসেও পাঠদান করতে হচ্ছে। ব্যবহারিক বিষয় পড়ানো হলেও বিভাগের নিজস্ব কোনো ল্যাব নেই। সেমিনার কক্ষ থাকলেও সেটি ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় নেই।
বিভাগীয় পর্যায়েও সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তার জানান, একই সময়ে চারটি বর্ষের ক্লাস পরিচালনা করতে গিয়ে শিক্ষকরা সমস্যায় পড়েন। বাধ্য হয়ে সেমিনার কক্ষকে পাঠদানের কাজে ব্যবহার করতে হয়।
তিনি বলেন, কলেজের ১৯টি বিভাগেই কমবেশি শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থী ও বিভাগের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী অবকাঠামো সম্প্রসারণ হয়নি। পুরোনো ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। এমনকি একবার ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের টেবিলের ওপরও ছাদের পলেস্তারা ভেঙে পড়েছিল। বড় কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত সংস্কার এবং নতুন একটি অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াসও শ্রেণিকক্ষের সংকটকে অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, একটি বিভাগের পাঁচটি শিক্ষাবর্ষের পাঠদানের জন্য অন্তত পাঁচটি কক্ষ প্রয়োজন। অথচ অধিকাংশ বিভাগে দুটি কক্ষের বেশি নেই। কিছু বিভাগে নতুন ভবনের লিফট ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হওয়ায় কক্ষ ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও সামগ্রিক সংকট কাটেনি।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়ে অধ্যক্ষ জানান, ঢাকা কলেজসহ সাত কলেজের উন্নয়নে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সেটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে কলেজগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই ঢাকা কলেজের পুরোনো ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত পাঠদান কক্ষ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হলে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশও ফিরে পাবে কাঙ্ক্ষিত মান।



