বাঙালির উৎসব মানেই ঢাকের ছন্দ, তালে তালে আনন্দের প্রকাশ। দুর্গাপূজা থেকে বিসর্জন, কালীপূজা কিংবা বিয়ের আয়োজন—বহু সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঢাকের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। কিন্তু আধুনিক সংগীতের বিস্তার, আয়োজকদের বাজেট সংকোচন এবং অনিয়মিত কাজের কারণে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা এখন জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
বংশপরম্পরায় শেখা শিল্প
ঢাক বাজানো অনেক পরিবারের কাছে শুধু পেশা নয়, বংশপরম্পরায় বহন করা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রবীণদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্ম শেখে তাল, লয় ও বিভিন্ন উৎসবের উপযোগী বোল। বিশেষ করে দুর্গাপূজায় প্রতিমা প্রতিষ্ঠা, আরতি, সন্ধিপূজা ও বিসর্জনের সময় ঢাকের ব্যবহার উৎসবকে আলাদা মাত্রা দেয়।
কিন্তু এই শিল্পের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, কাজের সুযোগ অনেকটাই মৌসুমনির্ভর। পূজার সময় কয়েক দিনের বায়না পেলেও বছরের অন্য সময়ে নিয়মিত আয় থাকে না অনেক শিল্পীর। ফলে একটি মৌসুমে আয় কম হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের জীবনযাত্রায়।
ডিজে সংগীতে কমছে চাহিদা
অনেক অনুষ্ঠানে ঢাকের পরিবর্তে ডিজে, রেকর্ড করা সংগীত ও ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। সহজে পাওয়া যায় এমন প্রযুক্তিনির্ভর সংগীতের কারণে কিছু আয়োজনে ঢাকীদের ডাক কমছে। পাশাপাশি পূজা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের বাজেট সীমিত হলে প্রথম দিকেই বাদ পড়ছে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে অনেক ঢাকী বিকল্প পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ গাড়ি চালাচ্ছেন, আবার কেউ ছোটখাটো ব্যবসা বেছে নিচ্ছেন। যাঁরা এখনো পেশাটি ধরে রেখেছেন, তাঁদের মধ্যেও সন্তানদের একই পেশায় আনার বিষয়ে অনীহা দেখা যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে দক্ষ ঢাকী তৈরির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পী থেকে কারিগর—সবাই চাপে
ঢাকের চাহিদা কমলে শুধু বাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন না। ঢাক ও অন্যান্য লোকবাদ্য তৈরির কারিগর, কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং বিক্রেতাদের আয়ও কমে যেতে পারে। ফলে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট অর্থনৈতিক পরিসরটিও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
তবে নতুন সম্ভাবনাও রয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ উৎসব, পর্যটন আয়োজন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে ঢাকের ব্যবহার বাড়ানো গেলে শিল্পীরা বিকল্প কাজ পেতে পারেন। ঢাক বাজানোর দলে নারীদের অংশগ্রহণও এই পেশায় নতুন মাত্রা যোগ করছে।
সংরক্ষণে প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ
ঢাকীদের জীবিকা নিশ্চিত করতে পূজার বায়নার বাইরে কাজের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসন লোকজ উৎসব এবং সরকারি সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাঁদের যুক্ত করতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, বাদ্যযন্ত্র কেনার সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পূজা উদযাপন কমিটিগুলোরও উচিত ঢাকীদের শ্রম ও দক্ষতার যথাযথ মূল্য দেওয়া। একই সঙ্গে ঢাক তৈরির কারিগরদের জন্য কাঁচামাল ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিল্পটির সঙ্গে যুক্ত পুরো জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়।
ঢাকের শব্দ কেবল উৎসবের আনন্দ নয়, এটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বহন করে। তাই ঢাকী পেশাকে বাঁচিয়ে রাখা মানে একটি জনগোষ্ঠীর জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। সময়োপযোগী উদ্যোগ না নিলে এই শিল্পের ছন্দ একদিন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসতে পারে।