দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান সমুদ্রদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি কাগজবিহীন ও স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। জাহাজ আগমন থেকে পণ্য খালাস ও সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এনে বন্দরের কার্যক্রমে গতি বাড়ানো, ব্যয় কমানো ও যানজট নিরসনই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
সম্প্রতি চবক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় বিদ্যমান ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ানো এবং বিভিন্ন বিভাগের প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অবশিষ্ট ম্যানুয়াল কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ৩৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮০ লাখ টন সাধারণ পণ্য এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে। দেশের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সাধারণ পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারভিত্তিক বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
চবক সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং লাইন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট অপারেটর, কাস্টমস ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন পক্ষের সমন্বিত কার্যক্রমের জন্য বিচ্ছিন্ন অনলাইন সেবার পরিবর্তে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ইতোমধ্যে জাহাজের বিলের ১০০ শতাংশ অনলাইনে প্রক্রিয়াকরণ হচ্ছে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারের সঙ্গে সোনালী ব্যাংক পিএলসির এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কনটেইনার ও কনসাইনি বিলিং টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টিওএস) সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে ছুটির দিনেও অনলাইনে অর্থ পরিশোধ করা যাবে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্দরের পাওনা পরিশোধ না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ আদায়ের জন্য চালু হবে ‘অটো-পুল পেমেন্ট সিস্টেম’।
এ ছাড়া টিওএসের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সমন্বয়ের মাধ্যমে আমদানি কনটেইনারের ডেলিভারি অর্ডার ডিজিটাল করা হচ্ছে। এতে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অগ্রগতি অনলাইনেই অনুসরণ করতে পারবেন আমদানিকারকেরা।
বন্দরের প্রবেশ ও বহির্গমনপথের যানজট কমাতে চালু হচ্ছে ‘টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট’, অনলাইন কার্ট টিকিট ও ই-গেট পাস। ইকুইপমেন্ট ইন্টারচেঞ্জ রিসিপ্ট (ইআইআর) ই-গেট পাসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ট্রাক প্রবেশ, পণ্য বোঝাই ও বের হওয়ার সময়সূচিও ডিজিটালভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
কাস্টমসের নিলামজাত পণ্য সরবরাহ, বিশেষ ডেলিভারি ও ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) কার্যক্রমও এনবিআর ও কাস্টমসের এপিআইয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিংয়েও ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
চবকের ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো-সিপিএ স্কাই’ প্ল্যাটফর্মে একক লগইনের মাধ্যমে বিভিন্ন বন্দরসেবা নেওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল রাডারের মাধ্যমে জাহাজের গতিবিধি তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণের সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে টিওএস ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার গেট প্রবেশ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, জাহাজ বন্দরে আসা থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ, কাস্টমস ছাড়পত্র, পণ্য খালাস ও চূড়ান্ত সরবরাহ—পুরো প্রক্রিয়াকে অনুসরণযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা হবে। এতে পণ্য খালাসে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি রাজস্ব আদায় দ্রুত এবং বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে।




