চট্টগ্রামের আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় মো. ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল এক দিনে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের বিরুদ্ধে। বদলির আদেশ পাওয়ার পর নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আগে এসব দলিল নিবন্ধন করেন তিনি। বিষয়টি জানার পর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রায়হান হাবীবের বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করেছে মন্ত্রণালয়। এদিকে দলিল নিবন্ধনের বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইয়াসিনের নামে থাকা জমিগুলোর বিক্রয় দলিল নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন। পরে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে জমিগুলোর বিক্রয় দলিল নিবন্ধন করা হয়।
তবে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের দাবি, জমিগুলোর নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের কাগজপত্র যাচাই করেই নিবন্ধন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সীতাকুণ্ডের ভূমি অফিসের নথিতে জমিগুলো ইয়াসিনের নামে রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দেওয়ায় বিধি অনুসরণ করে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও আগে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, বুধবার বিকেলে বিষয়টি জানার পর আইন মন্ত্রণালয়কে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। ইউএনওর জিজ্ঞাসাবাদে সাব-রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, ইয়াসিন নিজে তাঁর কাছে আসেননি; আবেদনকারী কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে।
সন্ত্রাসী তৎপরতা ও সরকারি জমি নিয়ে বিতর্ক
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কের পাশে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে ভূমি দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচিত। এলাকাটি জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর—এই দুই অংশে বিভক্ত। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ রয়েছে এলাকাটির বিস্তীর্ণ অংশে।
গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে দুটি চৌকি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সেখানে বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।
এর আগে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি এক আসামিকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হন র্যাব সদস্যরা। এ ঘটনায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন নিহত হন এবং আরও তিনজন গুরুতর আহত হন। হামলার ঘটনায় ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হয়েছে।
বিপুল মূল্যমানের জমি নিয়ে প্রশ্ন
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, লিংক রোডের আশপাশে প্রতি শতক জমির দাম ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। ফলে জঙ্গল সলিমপুরের জমি ঘিরে বিপুল অঙ্কের সম্পদের হিসাব রয়েছে। সরকারি খাসজমির পাশাপাশি সেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও রয়েছে। এসব জমির মালিকানা, দখল ও নিবন্ধন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির দলিল এক দিনে নিবন্ধনের বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জমিগুলোর মালিকানা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
উল্লেখ্য, গত সোমবার রায়হান হাবীবসহ দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে বদলি করা হয়। বৃহস্পতিবারের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশনা ছিল তাদের প্রতি।