রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন করে সংঘাতের রূপ নিয়েছে। পাহাড়ের দুই আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-মূল) বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায় এবং প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন।
এই বিরোধের জেরে টানা অবরোধে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সাজেক ও আশপাশের জনপদ। খাদ্য, ওষুধসহ জরুরি সামগ্রীর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। গত সোমবার পর্যন্ত অবরোধের ১৩ দিন পার হয়েছে। এর মধ্যে এক দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত রাখা হলেও সোমবার আবারও অবরোধ শুরু হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অবরোধ সাময়িকভাবে শিথিল করার পেছনে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। ওই সুযোগে ব্যবসায়ী ও দোকানিরা খাগড়াছড়ি এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তবে অবরোধ শিথিল থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে হতাহতের খবর না মিললেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নিয়ন্ত্রণ বদল ঘিরে সংঘাত
স্থানীয় ব্যবসায়ী, দোকানমালিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাজেকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই দুই সংগঠনের বিরোধ তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা কথিত সামরিক অবস্থান এবং চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রগুলো নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে জেএসএস।
একসময় সাজেক ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জেএসএসের প্রভাব ছিল। পরবর্তী সময়ে ইউপিডিএফ ওই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর পর্যটন ব্যবসা, হোটেল, মোটেল, দোকানপাটসহ বিভিন্ন খাত থেকে নির্ধারিত হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব উৎস থেকে বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে দাবি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) থেকে বেরিয়ে আসা একটি সশস্ত্র অংশ তরুণ চাকমার নেতৃত্বে জেএসএসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে। তাদের সম্মিলিত তৎপরতায় সাজেকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইউপিডিএফের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা জেএসএসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
দুর্বল হচ্ছে ইউপিডিএফের অবস্থান
খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের প্রভাবও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংগঠনটির এক সশস্ত্র সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষের ধারাবাহিক চাপের কারণে তাদের সাংগঠনিক ও সামরিক অবস্থান সংকুচিত হচ্ছে।
ওই সদস্যের দাবি, সম্প্রতি মাটিরাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় তাদের অস্ত্রের একটি চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। অন্যদিকে, জেএসএসের হামলার আশঙ্কায় সংগঠনটির কর্মীরা চাপে রয়েছেন।
ইউপিডিএফের প্রধান প্রসিত বিকাশ খীসা সাজেকের অবস্থান ধরে রাখার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংগঠনটির ভেতরের সূত্রে জানা গেছে। তবে সেই প্রচেষ্টা খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মীর।
এদিকে নিজেদের হারানো কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা এবং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার পাল্টাপাল্টি উদ্যোগে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে। গত দুই মাসে একাধিকবার দুই পক্ষের মধ্যে সশস্ত্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
অবরোধে সাধারণ মানুষ বিপাকে
দুই সংগঠনের বিরোধের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। পর্যটননির্ভর ব্যবসা, ক্ষুদ্র দোকান, পরিবহন ও অন্যান্য পেশার মানুষ দীর্ঘ অবরোধে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাজেকের বাসিন্দাদের দাবিকে সামনে রেখে বিভিন্ন ব্যানারে কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে সাধারণ পাহাড়ি নারী-পুরুষকে ব্যবহার করে কার্যত জনপদকে অবরুদ্ধ রাখা হচ্ছে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে অবরোধ পরিচালনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ পেশাজীবীদের নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। জেএসএস ও ইউপিডিএফ ছাড়াও ছোট-বড় একাধিক সশস্ত্র সংগঠনের প্রভাব রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় একাধিক গোষ্ঠীকে অর্থ দিতে হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পার্বত্য অঞ্চলে বিস্তৃত চাঁদাবাজির অভিযোগ
সাজেকের সংকটকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের মতে, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র সংগঠনগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা, গুম ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগও জড়িয়ে রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সংগঠনের কাছে নিয়মিত অর্থ না দিলে ব্যবসা পরিচালনা কিংবা স্বাভাবিকভাবে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চাইছেন।
গত ১৬ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরও নিরাপত্তাহীনতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এসব সমস্যা নিরসনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, পর্যটন সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল নয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধ করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাহাড়ের বাসিন্দারা সংঘাতমুক্ত পরিবেশে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।




