তৈরি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে ঘিরে রাজধানীর মিরপুরে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিশের তদন্তে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার অর্থায়ন এবং মাঠপর্যায়ে লোক সংগ্রহের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের। এ ঘটনায় দুই দিনে অন্তত ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিদেশে অবস্থান করে অর্থ ও নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দেশে থেকে লোকজন সংগঠিত করার দায়িত্বে ছিলেন ইলিয়াস মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এবং জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দাদের দাবি, শ্রমিকদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য আর্থিক প্রণোদনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিভিন্ন ঘটনার ছবি ও ভিডিও পাঠানোর পর মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের ব্যবহৃত মুঠোফোন পরীক্ষা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কাজ অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের মিছিলে উপস্থিতির জন্য ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। টায়ারে আগুন দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত অঙ্ক ছিল তিন হাজার টাকা। আর গাড়ি কিংবা স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের জন্য পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়ার পরিকল্পনার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার কাজে ছয় থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
ডিবির দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে ছবি ও ভিডিও সরবরাহ করতে হতো। কয়েকজন গ্রেপ্তার ব্যক্তির মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবে টাকা আসার তথ্যও পাওয়া গেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। কেউ রংমিস্ত্রি, কেউ রিকশাচালক, আবার কেউ গ্যারেজকর্মী কিংবা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাদের ফোনে বিভিন্ন নামে পরিচালিত ২০ থেকে ২৫টি অনলাইন গ্রুপের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা বিভাগ। এসব গ্রুপে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের ছবি-ভিডিও আদান-প্রদান করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ১১ জন হলেন মাহবুবুর রহমান জুয়েল (৩৮), মো. কামাল গাজী (৩২), মো. ওলীউল্লাহ অনিক (২০), আলিফ হোসেন ইমন (২৬), মো. নাহিদ হাসান (১৮), আরিফ আকন্দ (২৯), মো. রমজান সরকার (১৮), মোয়াজ্জেম শাহরিয়ার ওরফে নিয়াজ (২৬), জুবায়ের ইসলাম জিসান (২২), আরিফ (১৮) ও মাহিম মোল্লা (১৮)।
যোগাযোগের মাধ্যম অনলাইন গ্রুপ
পুলিশের তদন্তে আলিফ মোল্লাহ ও মাহবুবুর রহমান জুয়েলের নাম বিশেষভাবে এসেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ঢাকায় লোকজন জড়ো করার কাজে যুক্ত ছিলেন তারা। জুয়েল দীর্ঘদিন জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন বলে তদন্তে জানা গেছে। আলিফকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হলেও এখনো তাকে পাওয়া যায়নি।
তদন্তে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শুভ এবং রূপনগর আওয়ামী লীগের সদস্য কামাল গাজীর নামও এসেছে। তাদের মধ্যে জুয়েল ও কামাল গাজীকে রোববার মিরপুরের ১২ নম্বর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির মিরপুর বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শ্রমিকদের কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনকে সংগঠিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কক্সবাজার, নোয়াখালী ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক কর্মী রয়েছেন বলে পুলিশের ধারণা।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকে নিজ এলাকা ছেড়ে রাজধানীতে এসে শ্রমিক ও দিনমজুরের পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের একটি অংশ বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক মিছিল ও অন্যান্য কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
মিরপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কৌশল অনুসরণ করা হয়েছিল বলে দাবি পুলিশের। অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে নির্দেশনা পেয়ে তারা নির্দিষ্ট জায়গায় সমবেত হতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি বুঝে অবস্থান পরিবর্তনের নির্দেশনাও দেওয়া হতো।
তদন্তে একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের তথ্য
ডিবির অনুসন্ধানে আরিফ আকন্দ নামে ২৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যুবলীগ ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে।
তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে পরিচালিত একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ‘মেরিল্যান্ড আওয়ামী লীগ’, ‘সবুজ বাংলা চেতনা মুক্তিযুদ্ধ ৭১’, ‘স্পিরিট ৭১’, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা’, ‘বঙ্গবন্ধু আদর্শ গেরিলা ৭১’, ‘ঢাকা মহানগর উত্তর’ এবং ‘আমরা সবাই শেখ হাসিনার সৈনিক’ উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা ও বিভাগভিত্তিক সংগঠনের নামে আরও কয়েকটি গ্রুপে তার যুক্ত থাকার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। রূপনগরের শুভ ও আলিফ তাকে একটি কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলেও প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের গাড়িতে আগুনের ঘটনায় আলিফের নির্দেশনার দাবি
রোববার মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাটি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ডিবির দাবি, ওই সময় অনলাইন গ্রুপে বার্তা দিয়ে আলিফ মোল্লাহ কয়েকজনকে প্রথমে মিরপুর-২ নম্বরের লাভ রোডে এবং পরে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে জড়ো হতে বলেন।
পুলিশ সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকার সুযোগে সেখানে থাকা একটি গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট ছবি ও ভিডিও আলিফের কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি গোয়েন্দাদের। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ফোনে এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা ফেসবুকে প্রকাশ করার অভিযোগে রাজিব চন্দ্র দাস নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার রাতে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর থেকে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে পল্লবী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রাজিব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা ছাত্রলীগের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। অগ্নিসংযোগের ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পাঠানোর তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পল্লবী থানা পুলিশ।
চার মামলায় আসামি ১০ হাজারের বেশি
মিরপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ট্রাফিক পুলিশ বক্সে হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় তিন থানায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলাগুলোতে গত দুই দিনে থানা পুলিশ ও ডিবি মিলে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। রোববার আটক ২৬ জনকে সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। পরে পৃথক তিন মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
এর মধ্যে পল্লবী থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় ১৩ জন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির মামলায় সাতজন এবং মিরপুর মডেল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ছয়জন রয়েছেন।
এদিকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন সোমবারও অব্যাহত ছিল। টানা তৃতীয় দিনের মতো মিরপুরে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। দুই দফায় সড়কে নামার উদ্যোগ নেওয়া হলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার জানিয়েছেন, ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে আরও কয়েকটি মামলা করার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম ও প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের কর্মসূচিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে জড়িতদের ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
সোমবার সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে যারা শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী অভিযোগ করেন, কিছু পক্ষ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সড়কে অগ্নিসংযোগ ও অবরোধের মাধ্যমে অশান্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। অথচ প্রকৃত শ্রমিক ও তাদের প্রতিনিধিরা কর্মসংস্থান এবং শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হোক, তা চান না।
তিনি আরও জানান, সহিংসতার পেছনে ইন্ধনদাতা হিসেবে চিহ্নিত কয়েকজন ব্যক্তি ও শিল্পমালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অডিও-ভিডিওসহ পাওয়া প্রমাণ যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।