বর্ষায় চারপাশে থইথই পানি। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পাকা সড়ক। দুই পাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি, শাপলা ও নানা জলজ উদ্ভিদ। মাঝেমধ্যে অতিথি পাখির ঝাঁকও নামে পানিতে। এমন মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা একটি ছোট্ট চায়ের দোকান এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। নাম ‘চায়ের কুঠির’।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণ ক্রোকচর বাওর ব্রিজে প্রতিদিন বিকেল হলেই বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে ছুটে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। চায়ের পাশাপাশি উপভোগ করছেন গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাওরের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বর্ষায় এসব জমি পানিতে ডুবে যায়, আর শীতকালে পানি শুকিয়ে গেলে সেখানে বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। বিকেল নামতেই চায়ের কুঠিরের সামনে দীর্ঘ লাইন পড়ে। চায়ের পাশাপাশি রয়েছে চটপটি-ফুচকার দোকান ও দোলনা।
জানা গেছে, স্থানীয় কলেজপড়ুয়া তরুণ সালাহউদ্দিন, দীন ইসলাম, রাহাত ও শাকিল নিয়মিত বাওর ব্রিজে আড্ডা দিতেন। ইউটিউবে নির্জন গ্রামে চায়ের দোকানের একটি ভিডিও দেখে তারাও এমন একটি দোকান দেওয়ার উদ্যোগ নেন। নিজেদের শ্রমে তৈরি করেন ‘চায়ের কুঠির’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দোকান তৈরির ছবি ও ভিডিও প্রচারের পর গত ৬ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করা হয় দোকানটি।
এখানে পাওয়া যাচ্ছে রং চা, দুধ চা, মালাই চা ও পোড়া পাউরুটি। উদ্বোধনের পর থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের আগ্রহ। এখন প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকানটি জমজমাট থাকে।
উদ্যোক্তা দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাই লেখাপড়া করি। বিকেলে এই ব্রিজে আড্ডা দিতাম। একসময় মনে হলো এখানে একটি চায়ের দোকান দেওয়া যায়। ইউটিউবের ভিডিও দেখে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেরাই দোকান তৈরি করি। ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন প্রতিদিন প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। মাসে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকার চা বিক্রি হয়।’
আরেক উদ্যোক্তা মো. সালাহউদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‘আমরা ভাবতেই পারিনি এত বিক্রি হবে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার চা ও রুটি বিক্রি হয়। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি দুধের চা বিক্রি করি। শুরুতে দুটি দোকান ছিল, এখন এখানে পাঁচটি দোকান হয়েছে।’ শিবচর থেকে আসা তানভীর বলেন, ‘শুধু চা খেতে নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেও এখানে এসেছি। অন্য কোথাও এমন দোকান হলে হয়তো এত মানুষ আসত না। মূল আকর্ষণ এই জায়গার প্রকৃতি, সঙ্গে ভাইরাল চা।’
শরীয়তপুর থেকে আসা সৌদি প্রবাসী মো. সবুজ জানান, টিকটকের মাধ্যমে তিনি চায়ের কুঠিরের খবর পান। পরে দেশে ফিরে এখানে এসে চায়ের স্বাদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দুটোই উপভোগ করছেন। তরুণী সোনিয়া আক্তার বলেন, ‘চায়ের দোকানটি এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। অনেকেই চা খেতে এসে ছবি ও ভিডিও করছেন। মালাই চা ও পোড়া রুটির স্বাদও বেশ ভালো।’ আরেক তরুণী ইশরাত জাহান বলেন, ‘আধা ঘণ্টা ধরে চায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। প্রচুর ভিড়, দীর্ঘ সিরিয়াল।’
উদ্যোক্তা দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাই এখনো পড়াশোনা করছি। অবসর সময়ে চায়ের দোকান চালাই। বেকার থাকার চেয়ে ভালো একটি আইডিয়া নিয়ে শুরু করলে সফল হওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে এখানে আরও কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সারা বছর দর্শনার্থীদের আকর্ষণ ধরে রাখতে চাই।’ স্থানীয়দের মতে, প্রত্যন্ত গ্রামের এই ছোট্ট উদ্যোগ শুধু তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেনি, বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে এলাকাটিকে নতুনভাবে পরিচিত করে তুলেছে।




