নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল,কাচামাল পরিবহন সহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়ার জন্য রবিবার ১ নভেম্বর এক দিনের জন্য সাজেক সড়কে অবরোধ শিথিল করেছে আন্দোলনকারীরা। পাহাড়ী সম্প্রদায়ের মাসব্যাপী ধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দান পালনের সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চলাচলের সময় গাড়ী প্রবেশে সুযোগ দেয়া হবে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যাতে সুষ্ঠুাবে কঠিন চীবর দানোৎসব পালন করতে পারেন সেজন্য তাদের ক্ষেত্রে আলোচনা সাপেক্ষে বিশেষ শিথিলতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দুই সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন। এজন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বিহার কর্তৃপক্ষকে অবরোধকারী সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অবরোধ শিথিল থাকবে। পরদিন সোমবার থেকে আবারো অবরোধ চলমান থাকবে বলে জানান, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা। শুক্রবার(৩০ অক্টোবর) রাত পৌনে আটটায় এক ভিডিও বার্তায় অবরোধ শিথিলের তিনি এ ঘোষনা দেন। তৃতীয় দফা অবরোধ চলাকালীন নবম দিন শেষে শুক্রবার রাতে একদিনের জন্য অবরোধ শিথিলের এ ঘোষনা দেন সংগঠন দুটি।
এদিকে দফায় দফায় সাজেক সড়কে অবরোধের ডাক দেয়ায় সাজেকে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় একদিকে স্থবির হয়ে পড়ে সার্বিক পর্যটন খাত, অন্যদিকে সাজেক ইউনিয়নের বেশ কিছু দুর্গম গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের পাশাপাশি তীব্র ওষুধ সংকটের আশংকা দেখা দেয়। এ সংকট মোকাবেলা ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনা করার জন্য গত রবিবার (২৫ অক্টোবর) তিন সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।
এরপরই গত ২৬ অক্টোবর সংকট নিরসনে প্রথম বারের মতো রাঙ্গামাটি থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি খাগড়াছড়ির এমপি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও সাবেক পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি দুই জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার সহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সাজেক উজোবাজারে যান। সেখানে বিকাল সোয়া তিনটার দিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক শুরু হয়ে চলে প্রায় তিন ঘন্টাব্যাপী। বৈঠকে আন্দোলনকারী সংগঠন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা ও ছাত্র জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। তবে দীর্ঘ আলোচনায় পাচঁ দফার মধ্যে চার দফা সমঝোতা হলেও এক দফায় সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ কর্মসুচী অব্যাহত রাখে সংগঠন দুটি।
এর পর অবরোধ কর্মসুচী চালিয়ে যেতে থাকে সংগঠন দুটি। ফলে অবরোধের কারনে সাজেক ইউনিয়নে প্রায় ত্রিশ হাজারের অধিক বাসিন্দা বিভিন্ন সংকটে পড়ে।
এর আগে সাজেক থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার দাবীতে সড়ক অবরোধের কর্মসূচী ঘোষনা দেন ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত সংগঠন দুটি। প্রথম দফায় গেল ১১ অক্টোবর অবরোধ কর্মসুচী পালন করে। পরবর্তীতে সেখানে দেড় হাজার পর্যটক আটকা পড়লে প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে ৪৮ ঘন্টার আলটিমেটাম দিয়ে কর্মসুচী প্রত্যাহার করে। আলটিমেটাম শেষে ফের দাবী পূরন না হওয়ার অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর থেকে আবারও দ্বিতীয় দফা অবরোধ কর্মসূচী ঘোষনা করে। এরই মধ্যে সনাতন ধর্মাবল্বীদের শারদীয় দূর্গাপূজা শুরু হলে তা ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ কর্মসুচী স্থগিত করে। ছয়দিনের সময়সীমা শেষে সবশেষ তৃতীয় দফায় ২২ অক্টোবর থেকে আবারো অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসুচী পালন করে আসছিলো। এরই মধ্যে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী নির্দেষ না দেয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটন ভ্যালী বন্ধ ঘোষনা করে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন। একইদিন সাজেক পর্যটন কেন্দ্র থেকে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার সময়সীমা বেধে দেয় জেলা প্রশাসন।
অবরোধের কারনে সাজেক ভ্যালিতে ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক আটকা পড়েন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সাজেক থেকে পর্যটকদের গাড়ি বহরকে নিরাপত্তা দিয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে রওনা হয়। পর্যটকদের সরিয়ে নেয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অবরোধকারী এবং দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কনভয়টি সাজেকের উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনকারী ও পিকেটাররা সড়কে ব্যারিকেড ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে তাদের পথরোধ করে। দীর্ঘ সময় আলোচনার পরও অবরোধকারীরা পথ ছাড়তে রাজি না হওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়।